
প্রেস বিজ্ঞপ্তিঃ
চলমান এই কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতেও বিভিন্ন দেশে নারী ও মেয়েশিশুর প্রতি নানা ধরনের সহিংসতা, বিশেষ করে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে চলেছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চিত্রও এর ব্যাতিক্রম নয়। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর ২৫ নভেম্বর (আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস) থেকে ১০ ডিসেম্বর (বিশ্ব মানবাধিকার দিবস) পর্যন্ত ১৬ দিনের আর্ন্তজাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ পালিত হয়ে আসছে। এছাড়াও জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের নেতৃত্বে ২০৩০ সালের মধ্যে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করার জন্য (UNiTE ক্যাম্পেইন), একটি বহু বছরের প্রচেষ্টা যা ২০০৮ সালে শুরু হয়েছিল। বিশ্বব্যাপী নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধ ও নির্মূলে সচেতনতা বৃদ্ধি, অ্যাডভোকেসি জোরদার এবং প্রতিবন্ধকতা ও সমাধান সম্পর্কে আলোচনার সুযোগ তৈরি করার জন্য বিশ্বব্যাপী এই ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়ে থাকে। চলমান এই মহামারিতে সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য সহায়তা নিশ্চিত করতে এবারের প্রতিপাদ্য করা হয়েছে “কমলা রঙের বিশ্ব গড়িঃ এখনই নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করি”।
এরই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের উদ্যোগে অ্যাকশন এইড, এফএও, ইউএনএইচসিআর, ইউনিসেফ, ইউএন উইমেন এবং ডাব্লিউএফপি’র সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ৩০ নভেম্বর মঙ্গলবার কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প বর্ধিত ৪ -এ একটি আলোচনা সভা এবং মেলার আয়োজন করে। আলোচনা সভায় বক্তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে তাদের উদ্যোগ, প্রতিবন্ধকতা এবং এই সমস্যা সমাধানে করণীয় সম্ভাবনাময় দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, কক্সবাজারের বিভিন্ন দেশী এবং আর্ন্তজাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার কক্সবাজারের সাব অফিস প্রধান এবং প্রতিনিধিবৃন্দ, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, এপিবিএন ৮ এবং ১৪ এর প্রতিনিধি, ক্যাম্প ৪ এবং ৪ বর্ধিত এর ক্যাম্পইনচার্জ , অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার জনাব মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা।
এফএও কক্সবাজারের সাব অফিস প্রধান মার্কো দে গায়েতানো বলেন, আপনাদের খাবার ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। আজ নারী নির্যাতন প্রতিরোধ বিষয়ে আমরা সমবেত হয়েছি। নারীর প্রতি সহিংসতা এবং নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজিস্ট এবং রিজিওনাল কওর্ডিনেটর তানজিলা তাসনিম বলেন, মানবতার কল্যাণে আমরা রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য এখানে আছি। পরিবারে শুধু কন্যা সন্তান নয়, পুরুষ সন্তানরাও যেন নির্যাতনের শিকার না হয় সেদিকে অভিভাবকদের কাজ করতে হবে।
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ৮ এবং ১৪ এর প্রতিনিধি শোয়েব আহমেদ খান এবং শরীফুল ইসলাম বলেন, আমরা রোহিঙ্গা কমিউনিটির নিরাপত্তায় এবং সকল ধরনের সহিংসতা রোধে কাজ করছি। সমাজের অর্ধেক নারী। বিশেষ করে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আমরা বদ্ধ পরিকর। রোহিঙ্গাদের পাশে থাকার জন্য এপিবিএন এর পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সেবা সংস্থাগুলোকে ধন্যবাদ জানান।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে অ্যাকশনএইড কক্সবাজারের হেড অব প্রটেকশন নুজুলি বেগম, ইউএনএইচসিআর এর জিবিভি অফিসার টেরা ম্যাকিন্নন, ইউনিসেফের চাইল্ড প্রটেকশন স্পেসালিস্ট গের্টরুট মুবিরু, ডাব্লিউএফপি হেড অব প্রটেকশন রোলা আলকালিদ, ব্র্যাক এবং ডাব্লিউএইও এর প্রতিনিধিবৃন্দ স্বাগত বক্তব্য দেন।
সামছু-দ্দৌজা বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাল্য বিবাহ এবং বহু বিবাহ নারী প্রতি সহিসংতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিশু জন্মের হার স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। সারাদেশে যেখানে ১.১৮% সেখানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিশু জন্মের হার ৩.৫। করোনার কারনে অনেক কার্যক্রম বন্ধ ছিল, বর্তমানে অনেকাংশে স্বাভাবিক কাজ শুরু হয়েছে। তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন, এপিবিএন এবং সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান। রোহিঙ্গাদের কল্যাণে এগিয়ে আসা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
আলোচনা সভার সমাপনি বক্তব্যে ইউএন উইমেনের সাব-অফিস হেড ফ্লোরা ম্যাকুলা বলেন, বাংলাদেশ সরকার লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এ বিষয়ে কাজ করছে। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে রোহিঙ্গাদের নিজেদেরও সচেতন হতে হবে। তিনি নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষনা দিয়ে, এ বিষয়ে ক্যাম্প ইনচার্জ, এপিবিএনসহ সংশ্লিষ্টদের সহায়তা নেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারী, বেসরকারী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, রোহিঙ্গা নারী এবং সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান।
আলোচনা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইউএন উইমেনের কমিউনিকেশন অফিসার মাহমুদুল করিম। আলোচনা সভার পাশাপাশি সেখানে দিনভর মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় রোহিঙ্গা এবং হোস্ট কমিউনিটির নারীদের হাতের তৈরি নানা ধরনের পণ্য ও খাবার বিক্রি করা হয়। ক্যাম্প ৪ এবং ৪ এক্সটেনশনের সিআইসি মাহফুজার রহমান, ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার প্রধান ইটা শোয়েটা, আইএসসিজি’র সিনিয়র কর্ডিনেটর অর্জুন জেইন এবং হাই কমিশন অফ কানাডার হেড অফ এইড, ফেড্রা মুন মরিস মেলা পরিদর্শনে আসেন এবং মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। কমলা রঙের কাপড় পড়ে রোহিঙ্গা নারী এবং উন্নয়ন কর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠে।












