‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতের স্বজনদের চাওয়া একটাই- ওসি প্রদীপের ফাঁসি

0
5

শাহেদ মিজান:

তৎকালীন টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশের কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ কেড়ে নিয়েছিল অনেক তাজা প্রাণ। স্বজন হারানোর বিচার পাওয়ার আশায় অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন নিহতদের পরিবার। তাই ওসি প্রদীপের হাতে নির্যাতিত ও হত্যা হওয়া স্বজনদের পরিবারের একটাই চাওয়া তার ‘ফাঁসি’। অবশেষে নিহতদের পরিবারের মানুষদের প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হতে যাচ্ছে।

কারণ, আগামীকাল সোমবার (৩১ জানুয়ারি) দেশব্যাপী তুমুল আলোচিত সেনাবাহিনীর (অব.) মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার রায় দেওয়া হবে। কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. ইসমাঈল সেদিন এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন। এতে ওসি প্রদীপসহ ১৫ আসামির সাজা নির্ধারণ করা হবে।

সূত্র জানায়, দেশের চাঞ্চল্যকর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ হত্যার মামলায় রায়ের অপেক্ষায় থাকা বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও সাঙ্গপাঙ্গের ১৪৪টি কথিত বন্দুকযুদ্ধে ১৬১ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল নিরীহ মানুষ। বন্দুকযুদ্ধের সব ঘটনায় মোটা অংকের চাঁদা দাবি ও প্রতিপক্ষের কাছ থেকে মোট টাকা নিয়ে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। মেজর সিনহা হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার হলে বরখাস্ত ওসি প্রদীপ দাশ ও তার সহযোগিদের বিরুদ্ধে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার অভিযোগ এনে ১৫টির বেশি মামলা দায়ের করেছে নিহতের পরিবার। কিন্তু মামলাগুলোর কোনো অগ্রগতি হয়নি। মামলাগুলো অগ্রগতি না হওয়ায় বেশ হতাশ হয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তাই তারা সবাই চেয়ে আছেন সিনহা হত্যা মামলার রায়ের দিকে।

ভুক্তভোগী অনেক পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিনহা হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরুর পর থেকে বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশের সহযোগিদের বিচারের দিকে চেয়ে আছেন কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহতদের স্বজনেরা। এর মধ্যে ৩১ জানুয়ারি সিনহা হত্যা মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণা হলে ভুক্তভোগীরা আশান্বিত হয়ে ওঠেন। রায়কে ঘিরে টেকনাফে নিহতদের ঘরে ঘরে এখন অপেক্ষার প্রহর চলছে।

কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত টেকনাফের ১৬১ জনের স্বজনেরা এখন ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগিদের ফাঁসির রায় হওয়ার প্রার্থনা করছেন। তারা রোজা, নফল নামাজসহ বিভিন্নভাবে ইবাদত করে ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগিদের ফাঁসির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন। একই সঙ্গে ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগিদের ফাঁসির দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে নিহতের স্বজনেরা। এই দাবিতে শনিবার হাবিব পাড়ায় নিহতের স্বজনেরা একটি মানববন্ধনও করেছেন।

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের মৌলভীবাজার এলাকার একই পরিবারের পিতা-ছেলে দুইজনকে হত্যা করে ওসি প্রদীপ। পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০২০ সালে পৃথকভাবে তৎকালীন টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন চিংড়ি ব্যবসায়ী বাদশা ও তার পুত্র সাদ্দাম হোসেন। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে পিতা-পুত্রকে হত্যা করেছিলো ওসি প্রদীপ। ওসি প্রদীদের দাবি করা ২০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে না পারায় তাদের হত্যা করা হয়েছিলো— এমন অভিযোগ তার পরিবারের। এই অভিযোগে ওসি প্রদীপ ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের বিরুদ্ধে মামলাও করেছিলেন ভুক্তভোগী পরিবার।

চাঁদা দিতে না পারায় স্বামীকে হত্যা করেছে দাবি করে স্ত্রী লায়লা বেগম জানান, ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ বীজ ও সার আনতে উপজেলা সদরের কৃষি অফিসে গিয়েছিলেন টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নাজিরপাড়ার বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ। সেখান থেকে নূর মোহাম্মদকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন ওসি প্রদীপসহ অন্যান্যরা। চাঁদা দিতে না পারায় ২১ মার্চ রাতে নূর মোহাম্মদকে সৈকতের ঝাউবাগানে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এই ঘটনায় ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছিলেন নূর মোহাম্মদের স্ত্রী লায়লা বেগম।

২০১৯ সালের ১৮ অক্টোবর একই ইউনিয়নের ডেইলপাড়ার বাসিন্দা মো. আজিজ এবং স্থানীয় নুর হাসান ও আবুল খায়েরকে তুলে নিয়ে যায়। পরে মো. আজিজের পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করেন ওসি প্রদীপ; না দিলে আজিজকে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। এতে নিরুপায় হয়ে বিভিন্নভাবে ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে পুলিশকে দেয় আজিজের পরিবার। কিন্তু ১৯ অক্টোবর রাতে টেকনাফের মহেশখালীয়াপাড়া নদীঘাট এলাকায় আজিজকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছিলেন মো. আজিজের মা হালিমা খাতুন।

ওসি প্রদীপের হাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত যুবকের ভাই জালাল উদ্দীন বলেন, ‘ইয়াবা ব্যবসায়ীর তকমা লাগিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে; তা দিতে না পারায় আমার ভাইকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করেছিলেন ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগিরা। কিন্তু মামলা করেও আমি ভাই হত্যার বিচার পাইনি। তাই সিনহা হত্যা মামলার দিকে চেয়ে আছি।’

জালাল উদ্দীন আরও বলেন, ‘আমরা অধীর অপেক্ষায় রয়েছি, সিনহা হত্যা মামলায় ওসি প্রদীপ ও সহযোগিদের সবার ফাঁসি হবে। ভাইকে তো ফিরে পাবো না, অন্তত তাদের ফাঁসি হলে আমরা সান্ত্বনা পাবো। তাদের ফাঁসি হওয়ার জন্য আমরা আল্লাহর কাছে কান্না করে প্রার্থনা করছি।’

কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হোয়াইক্যং ইউয়িনের কাঞ্জর পাড়ার যুবলীগ নেতা মুফিজ আলমের পিতা গোলাম আকবর বলেন, ‘আমার ছেলেকে হত্যা করেছে ওসি প্রদীপ। তাকে আর কখনো ফিরে পাবো না। তার বিচারও পাবো না হয়তো। কিন্তু এখন আমি চেয়ে আছি সিনহা হত্যা মামলার দিকে। সিনহা হত্যা মামলায় ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগিদের ফাঁসি চাই আমরা। তাদের ফাঁসি হলে আমরা আল্লাহর কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া আদায় করবো।’

একই এলাকার নিহত সাহাব উদ্দীনের ছোট ভাই হাফেজ উদ্দীন বলেন, ওসি প্রদীপ টেকনাফকে নরকে পরিণত করেছিলেন। তার পাপ সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া আল্লাহ আর সহ্য করেননি। তার হাতে খুনের শিকার হয়ে যারা স্বজন হারিয়েছে ওসি প্রদীপ ও তার সহযোগিদের বিচার চাইতে পারেনি। কিন্তু অলৌকিকভাবে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন এবং তাদের ফাঁসিই হবে— আমরা এমন দোয়া করছি আল্লাহর কাছে।’

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে তিনটি (টেকনাফে দুটি, রামুতে একটি) মামলা করে। ঘটনার পাঁচ দিন পর ৫ আগস্ট কক্সবাজার আদালতে টেকনাফ থানার বহিষ্কৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ৯ পুলিশের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। চারটি মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব।

পরে ওই বছরের ১৩ ডিসেম্বর প্রদীপ কুমার দাশসহ ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও র‌্যাব-১৫ কক্সবাজারের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. খাইরুল ইসলাম। মামলায় ৮৩ জনকে সাক্ষী করা হলেও ৬৫ জনের সাক্ষ্য নিয়েছে আদালত।

এজাহারে নয়জনকে আসামি করা হলেও তদন্তের পর তিন স্থানীয়সহ আরো ছয়জনকে অন্তর্ভুক্ত করে তদন্ত কর্মকর্তা। মামলার ১৫ আসামিরা হলেন— বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, দেহরক্ষী রুবেল শর্মা, টেকনাফ থানার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, কনস্টেবল সাগর দেব, এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ, পুলিশের করা মামলার সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন।

এদিকে আলোচিত এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষে গত ১২ জানুয়ারি মামলায় উভয়পক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন শেষ করেন। যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত ৩১ জানুয়ারি মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও দেশের স্মরণকালের আলোচিত মামলা হওয়ায় সিনহা হত্যা মামলার কার্যক্রম বেশ গুরুত্ব দিয়ে সম্পাদন করা হয়েছে। ঘটনার দেড় বছর হলেও মামলার সাক্ষ্য, জেরা, আলামত প্রদর্শন, রাসায়নিক পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা, ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক, উভয় পক্ষের সমাপনী বক্তব্যসহ মামলার সকল বিচারিক কার্যক্রম মাত্র ৪০ কার্যদিবসে সমাপ্ত করা হয়েছে। এই নিয়ে বাদি, বাদিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষ বেশ সন্তুষ্ট।

আগেনাইক্ষ্যংছড়িতে শীতার্ত অসহায় মানুষের মাঝে বিজিবির শীতবস্ত্র ও মাস্ক বিতরণ
পরেপ্রদীপসহ সব আসামির মৃত্যুদণ্ড চায় রাষ্ট্রপক্ষ