কক্সবাজারে বন রক্ষায় প্রয়োজনে ফিফার কাছে যাবেন বিশিষ্টজনেরা

0
8

সমকাল:

কক্সবাজারের রামুতে সংরক্ষিত বন ও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে (বাফুফে) জমি বরাদ্দ দেওয়াকে ‘সংবিধান, আইন ও আদালতে আদেশের লঙ্ঘন’ বলেছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন, এর বাস্তবায়ন হলে সেখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়বে। বন রক্ষায় প্রয়োজনে সরাসরি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা’র কাছেও যাবেন বলে জানান বিশিষ্টজনেরা। ফলে দ্রুত এই বরাদ্দ বাতিলের পাশাপাশি বন-বিধ্বংসী সব কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে।

আজ বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (এএলআরডি), ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), নিজেরা করি, গ্রিন কক্সবাজার, ইয়ুথ ইনভায়রনমেট সোসাইটি (ইয়েস), কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলন ও সেইভ দ্যা কক্সবাজার।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কক্সবাজারের মোট বনভূমির এক-তৃতীয়াংশ (৭৬ হাজার ৯৮৬ একর) ইতোমধ্যে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বেদখল হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় কক্সবাজারের জঙ্গল খুনিয়াপালং সংরক্ষিত বনে একটি আবাসিক প্রশিক্ষণ একাডেমি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। সরকার ইতোমধ্যে সংরক্ষিত বনের ২০ একর জায়গা ডি-রিজার্ভ করে বাফুফেকে বরাদ্দ দিয়েছে। বাফুফের জন্য নতুন করে বনের জমি বরাদ্দ দেওয়া খুবই অসংবেদনশীলতার পরিচয়। টেকনিক্যাল সেন্টারটি করার জন্য উপযুক্ত বিকল্প স্থান হিসেবে চট্টগ্রামে জেলার বিভিন্ন অংশে থাকা ১০ লাখ ৮ হাজার ৭৬৮ একর অকৃষি খাসজমির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, আমরা বিদেশে গিয়ে আন্তর্জাতিক আইন স্বাক্ষর করে অঙ্গীকার করে আসি আমরা পরিবেশ ও জলবায়ু আইন পালন করব, কিন্তু বাস্তবে পালন না করে আইনকে অলঙ্কার স্বরূপ রেখে দেওয়া হয়। এমনকি হাইকোর্টের আদেশকেও অমান্য করা হয়। সরকার পরিবেশ, প্রকৃতি ও দেশকে হুমকিতে ফেলবে এমন বনভূমি জলাভূমি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিলেও তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি ও সংবিধানের লঙ্ঘন। ভবিষ্যতে এ ধরনের ইচ্ছেমতো বরাদ্দ দেওয়া বন্ধ করতে হবে। আমরা চাই টেকনিক্যাল সেন্টার হোক, তবে তা দেশের প্রকৃতি ও সম্পদকে নষ্ট করে নয়।

তিনি বলেন, বনের সঙ্গে শুধু গাছপালা জড়িত না, এর সঙ্গে জীববৈচিত্র্য, তাপমাত্রাসহ নানা কিছু জড়িত। দেশ ও জনগণকে রক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য তিনি বনের জমি বরাদ্দ না দেওয়ার দাবি জানান।

কক্সবাজারের বনে জমি বরাদ্দ দিলে ভূমিদস্যুরা উৎসাহিত হবে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যেনতেন যুক্তিতে যখন সংরক্ষিত বনভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়, তখন আইন ও সংবিধানের লঙ্ঘন হয়— এটি স্পষ্ট। সরকার যখন সংবিধান ও আইন লঙ্ঘন করে, তখন মানুষের কাছে ভুল বার্তা যায়। এতে ভূমিদস্যুরা উৎসাহিত হয়, তারা সুরক্ষা পায়। কক্সবাজারের বনভূমির এক-তৃতীয়াংশ দখল হয়ে যাওয়ার দায় সরকারকে নিতে হবে।

নিজেকে ফুটবলপ্রেমী দাবি করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমরা চাই বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ে ফুটবলের উন্নতি হোক, সে জন্য টেকনিক্যাল সেন্টারের প্রয়োজন আছে, আমরা চাই সেটি হোক। কিন্তু বিকল্প জায়গা থাকা সত্ত্বেও কেন ওই জায়গাতেই সেন্টার করতে হবে? বন ধ্বংস করা ফুটবল খেলার মৌলিক নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক বলে জানান তিনি।

ফিফা যাতে বাফুফের এই সেন্টার নির্মাণে বিনিয়োগ না করে, সে জন্য ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফিফার বিনিয়োগ যাতে পরিবেশ-প্রতিবেশগত ঝুঁকি সৃষ্টি না করে, সে ব্যাপারে তাঁরা অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রয়োজনবোধে সরাসরি ফিফার কাছেও যাব, ফিফা অবশ্যই বিষয়টি বিবেচনায় নেবে। আমি আশা করব, সরকার, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় নিজেদের এমন একটি বিব্রতকর অবস্থায় নেবে না যে এটি অনুমোদন পাওয়ার পর ফিফা বিনিয়োগ থেকে সরে দাঁড়ায়।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের এ ধরনের লঙ্ঘনে অসাধু জনগণ সুযোগ পেয়ে তারা আরও বেশি আইনের লঙ্ঘন করে প্রকৃতিকে নষ্ট করে। কক্সবাজারের বনভূমির এক তৃতীয়াংশ ধ্বংস হয়ে গেছে এই দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, কক্সবাজারে এই স্থাপনা নির্মাণের পেছনে কোনো যুক্তি নেই। এ ধরনের কাজ মন্ত্রণালয়ের চরম অসংবেদনশীলতা। যদি এমন কাজ করে তাহলে জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে অধিদপ্তর আর মন্ত্রণালয় রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।

বনের জমিতে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণকে ‘নেশা’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি বলেন, এটি একটি নেশা যে পর্যটন নগরীতে প্রত্যেকেই গিয়ে সেন্টার খুলব, সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়ে রেস্ট হাউস খুলব, এরপর সেখানে গিয়ে অবকাশ যাপন করব। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় কীভাবে এক কলমের খোঁচায় ২০ একর জমি দিয়ে দিতে পারে- এই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

রিজওয়ানা হাসান বলেন, বন অধিদপ্তরের আপত্তি না শুনে এই জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাহলে বন অধিদপ্তর রাখার দরকার কী? তিনি আরও বলেন, সংবিধানে বলা হচ্ছে, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নদী, জলাশয়, বন, বন্যপ্রাণী রক্ষা করা হবে। সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি ভেঙে যদি বন উজাড় করা হয়, তাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য কী রেখে যাচ্ছে? কয়েকটি ফিউচার পার্ক, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক! বন উজাড় করার ক্ষতি পূরণ করা যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনি পাহাড়, সমুদ্র সৃষ্টি করতে পারবেন না। গাছ লাগাতে পারবেন, কিন্তু বন সৃষ্টি করতে পারবেন না।

নাগরিক আন্দোলন নেতা স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, যে উন্নয়ন জীবনকে হুমকিতে ফেলে সেটি উন্নয়ন হতে পারে না। বন বানানোই চরম উন্নয়ন, যার উদাহরণ মধ্যপ্রাচ্য। মরুভূমিতে একটি গাছের পরিচর্যায় তারা প্রচুর অর্থ খরচ করে। অকারণে একটি গাছ মারা গেলে তার জন্য বিচারের আওতায় আনা হয়। আর আমরা বন ধ্বংস করি। পৃথিবীর এমন কোনো রাজধানী নেই যার চারপাশে ৫টি নদী আছে কিন্তু সেটি ঢাকা শহরের আছে। আর কলকারখানার বর্জ্য, সুয়ারেজের পানি এসব নদীতে ফেলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাচ্ছি। আমরা চাইলে যে ভালো কিছু করতে পারি তার উদাহরণ হাতিরঝিল। আমার মনে হয় আমলারা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। প্রধানমন্ত্রী বলেন আর কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এর মাধ্যমে তিনি আগের অপরাধীদের ক্ষমা করে দেন।

লিখিত বক্তব্যে গ্রিন কক্সবাজারের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, কক্সবাজার জেলায় মোট বনভূমির পরিমাণ ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৬ একর, যার মধ্যে অবৈধ দখলে গেছে ৪৫ হাজার ৯৯০ একর। ৪৩ হাজার ৫৬৮ জন অবৈধ দখলদার ও ৬৯৬টি প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে এই বনভূমি দখল করেছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের জন্য ৬ হাজার ১৬৪ একর বনভূমি উজাড় হয়ে গেছে, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে আরও ১৪ হাজার ৩৭২ একর। বন বিভাগ সরেজমিনে তদন্ত করে বাফুফের ‘টেকনিক্যাল সেন্টার’ নির্মাণের জন্য যে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেটি দেওয়া সমীচীন হবে না বলেও উল্লেখ করেছিল বলে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়।

তিনি বলেন, দেশের বনভূমি রক্ষায় রয়েছে সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি। রয়েছে আইন, নীতি, আদালতের নির্দেশ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্দোবস্তযোগ্য পতিত জমি ও অকৃষি খাস জমি থাকা সত্ত্বেও কেন বারবার চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার বনভূমিকে উন্নয়নের নামে বনবিরুদ্ধ ব্যবহারের জন্য বেছে নেওয়া হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়। ইতোপূর্বে এই মন্ত্রণালয় কক্সবাজার জেলার ঝিলংজা মৌজার ৭০০ একর বনভূমি বঙ্গবন্ধু একাডেমি ফর পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন প্রতিষ্ঠার জন্য বরাদ্দ প্রদান করেছিল, যা আদালতের আদেশে স্থগিত আছে।

সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন বাপার সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল। তিনি বলেন, কক্সবাজার শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে উন্নয়ন জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে, তাকে উন্নয়ন বলা যায় না। কক্সবাজারের বন ধ্বংস হলে ওই এলাকার উষ্ণতা বাড়ার পাশাপাশি বায়ুদূষণ আরও বাড়বে।

সংবাদ সম্মেলনে আসকের প্রধান নির্বাহী গোলাম মনোয়ার, এএলআরডির উপ-প্রধান নির্বাহী রওশন জাহান মনি, ব্লাস্টের আইন উপদেষ্টা এসএম রেজাউল করিম, ইয়েস এর প্রধান নির্বাহী ইব্রাহীম খলিল মামুন, কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সভাপতি নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) উপপরিচালক (আইন) মো. বরকত আলী, সেইভ দ্য কক্সবাজারের সভাপতি আনছার হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

আগেরামুতে মুজিববর্ষের ঘর পেল আরো ১৩০ পরিবার
পরে‘মাদক কারবারি’ রোজিনার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা