বাংলাভাষা মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতির ইতিহাস

0
5
ইউসুফ আরমান:
মায়ের ভাষায় কথা বলার মত পরিতৃপ্তি অন্য কোনভাবেই সম্ভব নয়। মাতৃভাষার মাধ্যমে মানুষ মনোভাব প্রকাশ করে থাকে উত্তম ভাবে। জ্ঞান-বিজ্ঞান সাহিত্য চর্চার উপযুক্ত বাহন হল মাতৃভাষা। সাম্প্রতিককালে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও অনন্য মর্যাদার বিষয় টি উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত মহান শহীদ দিবস টি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতির মাইলফল।
রাষ্ট্র ভাষার প্রস্তাবঃ- ১৯৪৭ সালের ১২ই আগষ্ট করাচিতে প্রথম পাকিস্তানিে গণপরিষদে অধিবেশন শুরু হয়। এই সভায় উদ্বোধনী বক্তৃতা দেন কায়েদ আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ১৯৪৮ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম শুরু হয় অধিবেশনের প্রথম দিনেই কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দু’টি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি প্রস্তাবে উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলা কে ও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের স্বীকৃতির দাবী করেন। তার বক্তৃতায় তিনি বলেন যে, পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লক্ষ অধিবাসীর মধ্যে ৪ কোটি ৪০লক্ষ লোকেই বাংলা ভাষায় কথা বলে। এ প্রসঙ্গে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, মানি-অর্ডার ফরমে মুদ্রিত রয়েছে কেবল ইংরেজি ও উর্দু ভাষা এবং ডাকটিকেটের উপরও লেখা ইংরেজি-উর্দু। এতে পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ বিভিন্ন অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে। এজন্য গণপরিষদে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে তা গণ্য হবে। অতএব ২৯বিধিতে  English  শব্দের পর Bangalee শব্দটি অন্তর্ভূক্ত করা হোক।
আন্দোলনের সূচনাঃ- ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে এই আন্দোলন ঘটে। বাংলাভাষা ব্যবহরের দাবী নিয়ে পূর্ববঙ্গে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। আন্দোলনের উদ্যোক্তা ছিলেন পলাশী ও নীলক্ষেত ব্যারাকের সাধারণ সেক্রেটারিয়েট কর্মচারীবৃন্দ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র ও তাদের মিছিলে শরিক হয়েছিল। তারা মিছিলে ও প্রতিবাদ সভায় বাংলা কে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওযার ও অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা ঘোষণার দাবী জানান। পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের আর্থ-সামাজিক ও রাজৈনিতক ক্ষেত্রে শোষণ করে ক্ষান্ত হয় নি। তারা আঘাত হানে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির উপর। আমাদের বাংলাভাষা কেড়ে নেয়ার পায়তারা চলে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী জিন্নাহ উর্দু কে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে ঘোষণা দিলে বাংলার আপামর জনসাধারণ প্রতিবাদী হয়ে উঠে।
রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই শ্লোগানঃ- ২১শে ফেব্রুয়ারী ভোর থেকেই ছাত্ররা তাদের আন্দোলনের পক্ষে তৎপরতা শুরু করে। কিছু ছাত্র ঢাকা শহরে পিকেটিং করার জন্য বেরিয়ে পড়েন এবং তখনকার ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান এলাকা নবাবপুরে পিকেটিং শুরু করেন। সকাল ১০ টার দিকে তখনকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনের আমতলায় ( বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগ বা ইমার্জেন্সী শাখা যেখানে অবস্থিত তার সন্নিহিত এলাকা সমূহ) ছাত্রদের সভা শুরু হয়। বেলা ১১ টার দিকে সভা শেষ হয় পরে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বাইরে বেরুবার পালা। ইতোমধ্যে যখন ১০ জন করে বেরুবার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছিল তখন ছাত্র ও পুলিশের মধ্যে কিছু ইট পাটকেল ছোঁড়াছুড়ি হয়। এরপর পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার মধ্যে সমবেত ছাত্রদের দিকে কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এই সব ঘটনার ফলে ছাত্রদের বাইরে বেরুনো বিলম্বিত হচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত বেলা ১২ টার দিকে হাবিবুর রহমান শেলীর নেতৃত্বে প্রথম দলটি গেইট থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। তারা “রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই শ্লোগান” দিতে থাকেন। এভাবে ছাত্রদের দুই তিন টি দল রাস্তায় নেমে পড়ার পর ছাত্রীদের কয়েক টি দল ও রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে ১৪৪ধারা ভঙ্গ করে যারা বাইরে বের হয়ে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে গাড়িতে তুলছিল। ক্ষোভ-বিক্ষোভে উত্তেজনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল ঢাকা শহর। সে উত্তেজনা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র পূর্ব বাংলায়। সে দিন ট্রেন চলাচল সহ সকল ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল।  ২১শে ফেব্রুয়ারী তারিখে গুলি চলেছিল মোট ২৭ রাউন্ড। সে দিন হতাহত হয়েছিল মোট ২১ জন এর মধ্যে নিহত হয়েছিল ৪জন। ততক্ষণে সারা শহরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দোকানপাট ও যানবাহন চলাচল স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু রাস্তায় ছিল অসংখ্যা মানুষ। তাদের চোখে মুখে ছিল যন্ত্রণা ও ক্ষোভের ছায়া।
অমর একুশ বিশ্ব ইতিহাসেঃ- ১৯৫২ সালের মাতৃভাষা বাংলা কে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে মর্যাদা দানের জন্য সংগ্রামী বাঙালী আত্মাহুতি দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারী কে শহীদ দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সেই শহীদ দিবসই আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সাধারণ অধিবেশনের গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়ে যে ১৯৫২সালের একুশে ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশের মাতৃভাষার জন্য অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ এবং সে দিন যারা প্রাণ উৎসর্গ করেছেন তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে দিন টিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এ প্রস্তাবের ফলে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বর সহ আরো অনেকে ভাষা শহীদের রক্তে রাঙানো অমর একুশে বিশ্ব ইতিহাসে এক নতুন মর্যাদা পেয়েছে। নতুন সহস্রাব্দে বাঙালী জাতির চির গৌরব মহান ভাষা আন্দোলনে বিশ্ববাসীর চেতনায় এক নব মহিমায় উদ্ভাসিত হবে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসঃ- মাতৃভাষার মর্যাদার প্রতি এই বিশ্ব স্বীকৃতি সকল জাতির মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা বৃদ্ধি করছে। সহনশীলতা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে বিশ্ব মানবের সংহতি আরো বৃদ্ধি পাবে বলে প্রত্যাশা করা যায়। ১৯৫২সালের একুশে ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশে মাতৃভাষার জন্য অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ এবং স্মৃতির উদ্দেশ্যে দিন টি কে ” আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” ঘোষণা করা হয়েছে।
লেখক পরিচিতি
ইউছুফ আরমান
ফাজিল, কামিল
বি.এ অনার্স, এম.এ
এলএল.বি
দক্ষিণ সাহিত্যিকাপল্লী
বিজিবি স্কুল সংলগ্ন রোড়
পৌরসভা, কক্সবাজার
০১৬১৫৮০৪৩৮৮
আগেটেকনাফ বনবিভাগের অভিযানে মাটিভর্তি ডাম্পার জব্দ
পরেচকরিয়ায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে র‌্যাবের অভিযান, আড়াই লাখ টাকা জরিমানা