
সিবিকে ডেস্কঃ
পুরনো বছরের গ্লানি ভুলে নতুনকে স্বাগত জানানোই কালের নিয়ম। তবে করোনা মহামারিসহ নানা কারণে বিশ সালের মত বিষিয়ে তোলা একুশটাকে বিদায় করে নতুন প্রত্যাশা সকলের। বছরজুড়ে করোনার প্রকোপ। একের পর এক মৃত্যুর মিছিল, প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা, হতাশা নানা ঘটনা দুর্ঘটনা— সব গ্লানি ভুলেই শুক্রবার মধ্যরাতে নতুন বছরকে বরণ করে নিবে ক্লান্ত শ্রান্ত চরম বিপর্যস্ত পৃথিবী। বাদ যাচ্ছে না চট্টগ্রামের মানুষও।
করোনাসহ নিরাপত্তা ইস্যুতে বিধি-নিষেধ থাকলেও নিজ বাসা বাড়ির আঙ্গিনায় অনেকে নববর্ষ বরণের আয়োজন করছে অনেকে। আবার চট্টগ্রামের অনেক রেস্টুরেন্টেও থাকছে বর্ষবিদায় ও বরণের নানা আয়োজন। অনেকে বছরের শেষ সূর্যাস্ত দেখতে ভিড় করেছেন পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে। যদিও সন্ধ্যা ৬টার পর সবাইকে ছাড়তে হচ্ছে সৈকত এলাকা।
নতুন শতাব্দীর তৃতীয় দশকের দ্বিতীয় বর্ষে পা রাখার মূহুর্তে তাই একটিই চাওয়া—দুর্বিষহ নানা ঘটনা থেকে মুক্ত হোক বিশ্ব। প্রতিটি মানুষ নিঃশ্বাস নিক প্রাণভরে। আবারও সবাই মেতে উঠুক সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে, বৈরী সময়কে মাড়িয়ে হেসে গেয়ে উঠুক জীবনের জয়গান।
করোনা বোঝে না হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান। বোঝে না নারী-পুরুষ, শ্রেণি বিভাজন। তাই বিদায়ী বছরে বাধ সেধেছে অনেক ধর্মীয় উৎসবের আনন্দে। রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলেও ঘটনা অঘটন কম ছিল না। বছরজুড়েই চট্টগ্রামে সিডিএ-চসিকের অবহেলায় নালায় পড়ে বৃদ্ধ, শিশু, শিক্ষার্থীর মৃত্যু যেমন নগরবাসীকে ভুগিয়েছে। তেমনি আগুনে পুড়েও অঙ্গার হয়েছিল অনেক মানুষ। ছিল উন্নয়নের নামে বছরজুড়ে নাগরিক দুর্ভোগ। এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে হয়েছে হানাহানিও। এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৬৩৩ জন ও মারা গেছেন ১ হাজার ৩৩২ জন মানুষ।
বছরের শেষ দিকে এসে ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণের ৪ বছরের মাথায় বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের আরাকান সড়কমুখী দুটি র্যাম্পের পিলারের ফাটলের খবরে চট্টগ্রামজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমান বন্দর দিয়ে একের পর এক স্বর্ণের চালান ধরা পড়ায় যেমন বিমান বন্দরটি আলোচনায় ছিল তেমনি বিদেশগামীদের পিসিআর ল্যাব বসানো নিয়েও সরব ছিল। এছাড়া সারা বছরই টিকা নিয়ে সরগরম ছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনা ছিল নগরের প্রাণকেন্দ্রে সিআরবির পরিত্যক্ত ভূমিতে পিপিপির আওতায় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ নিয়ে চট্টগ্রামের সরকারদলীয় নেতাদের সাথে রেলওয়ের বিরোধ। নজিরবিহীনভাবে টানা তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে সিআরবি থেকে হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প বাতিলে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন পরিবেশবাদীসহ আন্দোলনকারীরা। তাছাড়া হবে হবে বলেও আলোর মুখ দেখলো না কালুরঘাট সেতুর নতুন প্রকল্পটি। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিতব্য দেশের একমাত্র বঙ্গবন্ধু টানেলের উদ্বোধন ঘিরে আলোচনায় ছিল চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের বেশ কজন গুণীজনকেও হারাতে হয়েছে ২০২১ সালে।
স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে চট্টগ্রামে উল্লেখ করার মত কোন অর্জন না থাকলেও রোহিঙ্গা সংকট, পর্যটক নির্যাতনসহ নানা ইস্যুতে কক্সবাজারও ছিল আলোচনা সমালোচনার কেন্দ্রে। এরপরও নতুন পথে পা বাড়ানোর জন্য শুধরে নিতে হয় ভুলভ্রান্তি। অপ্রাপ্তি ও বঞ্চনার খাতা খুলে দেখতে হয় আগামীতে প্রাপ্তির হিসাব মেলাতে।
এদিকে করোনার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় জানিয়ে সবাইকে খ্রিস্টীয় নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেন, ‘বাংলা নববর্ষ আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকলেও ব্যবহারিক জীবনে খ্রিষ্টীয় বর্ষপঞ্জিকা বহুল ব্যবহৃত। খ্রিষ্টাব্দ তাই জাতীয় জীবনে প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে আছে। প্রতিবছর নববর্ষকে বরণ করতে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী বর্ণাঢ্য নানা আয়োজন করা হলেও করোনা মহামারির কারণে বিগত বছরের মতো এবারের উৎসবের আমেজও অনেকটাই ম্লান।’
রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে তবে বিশ্বব্যাপী করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে সতর্কতা প্রতিপালনের বিকল্প নেই উল্লেখ করে একজনের আনন্দ যেন অন্যদের বিষাদের কারণ না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে দেশবাসীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নববর্ষ উদযাপনের আহ্বান জানিয়েছেন ।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০২০ এবং ২০২১ খ্রিষ্টাব্দ বাঙালি জাতির জীবনে ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের অনুষ্ঠান-২০২১ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানের সঙ্গে একযোগে পালনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এরই মধ্যে ২০২১ সালের মার্চ মাসে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ১০-দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করি, যেখানে সার্কভুক্ত ৫টি দেশের রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধানগণ সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানমালায় যোগ দিয়েছিলেন। তাছাড়া বিশ্বের ৭৭টি দেশের রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধানগণ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানগণ ভিডিও বার্তা ও অভিনন্দন পত্র প্রেরণ করেছেন, যেখানে সকলেই আমাদের সরকারের গৃহীত উন্নয়ন কর্মকান্ডের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। আমাদের সরকারের উদ্যোগে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের রাজধানী এবং গুরুত্বপূর্ণ শহরে জাতির পিতার নামে স্মারক ভাস্কর্য স্থাপন, সড়ক ও পার্কের নামকরণ করা হয়েছে। ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে সৃজনশীল অর্থনীতিতে আন্তজার্তিক পুরস্কার প্রবর্তন করেছে।’
নববর্ষ মানেই সকলের মাঝে জাগায় প্রাণের নতুন স্পন্দন, নতুন আশা, নতুন সম্ভাবনা। বিগত বছরের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা পেছনে ফেলে নতুন বছরে অমিত সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়া। স্বভাবতই নতুন বছর নিয়ে এবারও মানুষের প্রত্যাশা একটি করোনা মুক্ত বিশ্ব। তবে, করোনার টিকা ছাড়াও অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনাসহ মানবসম্পদ তৈরির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হচ্ছে গতবছরের মত আগামী বছরের মোটা দাগের চ্যালেঞ্জ। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে, এটাই নতুন ইংরেজি বছরে সবার প্রত্যাশা।













