
আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগের নতুন কমিটির চেয়ারম্যান পদে শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক পদে মহিউদ্দিন মহির নাম বেশ জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে।
পরশ সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির বড় ছেলে আর মহি বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এর বাইরে এই দুই পদের জন্য আরও এক ডজন নেতার নাম নিয়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
যার মধ্যে রয়েছে বর্তমান কমিটির প্রেসিডিয়ামের কয়েকজন সদস্য, কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
আরও জানা গেছে, বর্তমান কমিটির অধিকাংশই নতুন কমিটিতে স্থান পাচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধে ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি, চাঁদা ও টেন্ডারবাজির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, দলীয় কোন্দল সৃষ্টি, অনুপ্রবেশসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে।
পাশাপাশি বর্তমান কমিটির যাদের বয়স ৫৫ বছর অতিক্রম করেছে, তাদেরও জায়গা হচ্ছে না নতুন কমিটিতে। অন্যদিকে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, দলের প্রতি নিবেদিত, ত্যাগী ও জনপ্রিয় নবীন-প্রবীণ সমন্বয়ে গঠন করা হচ্ছে সংগঠনটির নতুন কমিটি।
যুবলীগের ৭ম কংগ্রেস আগামীকাল শনিবার। এই কংগ্রেসের মাধ্যমেই সংগঠনটির নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নামও এদিন ঘোষণা করা হতে পারে।
এবারের কংগ্রেসে বর্তমান চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, প্রেসিডিয়াম সদস্য নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন, শেখ ফজলুর রহমান মারুফ ও শেখ আতিয়ার রহমান দীপুকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। যুবলীগের দফতর সূত্রে জানা গেছে, গণভবন থেকে ‘সবুজ সংকেত’ না মেলায় তাদের দাওয়াতপত্র দেয়া হয়নি। তবে ওমর ফারুক চৌধুরী বুধবার টেলিফোনে যুগান্তরের কাছে দাবি করে বলেন, ‘আমন্ত্রণ পেয়েছি এবং কংগ্রেসে যাব।’
সম্মেলনের নেতৃত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যুগান্তরকে বলেন, নতুন সম্মেলন মানেই নতুন মুখ। অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বের পরিবর্তন এসেছে। যুবলীগেও আসবে। তরুণ ও অভিজ্ঞদের সমন্বয় ঘটিয়ে কমিটি হবে।
ইতিমধ্যে নেতৃত্ব চূড়ান্তও হয়েছে, যা নির্ধারিত সময়ে দলীয় সভাপতি (শেখ হাসিনা) ঘোষণা করবেন।
চেয়ারম্যান পদে চূড়ান্ত তালিকায় থাকা শেখ ফজলে শামস পরশ পেশায় একজন শিক্ষক। তিনি ১০ বছর থেকে রাজধানীর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর করেন পরশ। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজিতে ফের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
ফজলে শামস পরশ ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের বড় ভাই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দিন তার বাবা-মা প্রাণ হারান। পরশের বর্তমান বয়স ৫১ বছর।
ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নীতিনির্ধারক প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়ে যুগান্তরকে বলেন, প্রথমে তাপসকে চেয়ারম্যান করার চিন্তাভাবনা ছিল হাইকমান্ডের। কিন্তু তাপস যুবলীগের নেতৃত্বের প্রতি অনাগ্রহ প্রকাশ এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করায় পরশকে যুবলীগের নেতৃত্বে আনার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সাধারণ সম্পাদক হিসেবে চূড়ান্ত তালিকায় থাকা মহিউদ্দিন মহির গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থনা ব্যবস্থাপনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।
২০০৩-১২ পর্যন্ত মহি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬-এর ২৮ অক্টোবর জামায়াত-শিবির প্রতিরোধের আন্দোলনে মুখোমুখি সংঘর্ষে সরাসরি অংশগ্রহণ ও ১/১১-পরবর্তী নেত্রী (শেখ হাসিনা) মুক্তি আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন যুবলীগের এ নেতা। বর্তমানে তার বয়স ৫১ বছর ১১ মাস।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রে আরও জানা গেছে, চেয়ারম্যান পদে আরও যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- কংগ্রেস প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক চয়ন ইসলাম (৫৮ বছর), বর্তমান প্রেসিডিয়াম সদস্য- ফারুক হোসেন (৫৭ বছর ১১ মাস), মুজিবুর রহমান চৌধুরী ও ডা. মোখলেছুর রহমান হিরু, যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মির্জা আজম (৫৭ বছর ২ মাস) প্রমুখ। সাধারণ সম্পাদক পদে যারা আলোচনায় আছেন তারা হলেন- যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনজুর আলম শাহীন (৫৩ বছর ১০ মাস)। প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট বেলাল হোসেন (৫৪ বছর ১০ মাস), আতাউর রহমান (৫২ বছর ৭ মাস), সুব্রত পাল (৫০ বছর ১ মাস), সাংগঠনিক সম্পাদক মো. এমরান হোসেন খান (৫৪ বছর ৮ মাস)।
তথ্যমতে, ক্যাসিনোসহ নানা অপকর্মে সংগঠনটির নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগে ব্যাপক পরিবর্তনের আভাস দিয়েছিল আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। ইতিমধ্যে তিন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগে সম্মেলনের মাধ্যমে নেতৃত্বের পরিবর্তন এসেছে।
যুবলীগে পরিবর্তনের বিষয়টি ও নেতৃত্বে কারা আসছেন তা নিয়ে সম্প্রতি গণভবনে দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। সেখানেই পরশ আর মহির নামটি আলোচনায় আসে।
শনিবার বেলা ১১টায় ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুবলীগের জাতীয় কংগ্রেস উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কংগ্রেসকে সামনে রেখে ইতিমধ্যে নেতাদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। ৫৫ বছরের বেশি বয়সের কোনো নেতা এবারের কংগ্রেসে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবেন না।
ফলে সংগঠনটির শীর্ষ পদপ্রত্যাশী প্রভাবশালী অনেক নেতার মাথায় হাত পড়েছে। বয়সের কারণে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও কংগ্রেস প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব হারুনুর রশিদ নতুন কমিটিতে থাকতে পারছেন না। ২০১২ সালের ১৪ জুলাই যুবলীগের ষষ্ঠ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ৩ বছর মেয়াদি এ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৫ সালে।
জানতে চাইলে যুবলীগের কংগ্রেস প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক চয়ন ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এবার সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব আসবে। বিতর্কিতরা বাদ পড়বেন। কংগ্রেস প্রস্তুতি সম্পন্ন। নিজে প্রার্থী কি না জানতে চাইলে বলেন, প্রত্যাশা তো সবারই থাকে। তবে নেত্রী (শেখ হাসিনা) যাকে দায়িত্ব দেবেন তার নেতৃত্বেই যুবলীগ সামনে এগিয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, বুধবার গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। সেখানে কংগ্রেসের প্রস্তুতির সর্বশেষ অবস্থা অবহিত করেছি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, হাইকমান্ডের নির্দেশে যুবলীগের বয়সসীমা ৫৫ বছর নির্ধারণ করে গঠনতন্ত্র সংশোধনের খসড়া চূড়ান্ত করা আছে। সেটি কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে উপস্থাপন করা হবে।
জানা যায়, ক্যাসিনোকাণ্ডে চলমান অভিযানে যুবলীগের অনেক নেতা গ্রেফতার হয়ে কারাগারে। দেশের ভেতরে ও বাইরে পলাতকের সংখ্যাও কম নয়। শীর্ষ কয়েক নেতা এখনও আতঙ্কে।
ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িত অন্য নেতাদের সঙ্গে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর নাম আলোচনায় আসে।
বিষয়টিতে বিব্রতবোধ করে আওয়ামী লীগ। নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় তাকে। গণভবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আসে তার ওপর। তলব করা হয় ব্যাংক হিসাব। বিদেশ সফরেও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
ইতিমধ্যে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকারী নেতাদের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন। অপরাধী যেই হোক কোনো ছাড় দেয়া হবে না বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনার পর চলমান অভিযানে অনেক নেতাকর্মী গ্রেফতার ও রিমান্ড আতঙ্কে আছেন। ফলে আসন্ন সম্মেলনে প্রার্থী হওয়া না-হওয়া নিয়েও দোলাচলে আছেন অনেকে।
জানা যায়, যুবলীগের ৩৫১ সদস্যের বর্তমান কমিটিতে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া সবার বয়স ৬০ বছর পেরিয়ে গেছে। কারও কারও বয়স ৭০-এর কোঠা ছাড়িয়েছে।













