পবিত্র রমজানুল মুবারকে তারাবীহ সালাতে তাড়াহুড়া কাম্য নয়

0
5
মুফতি দিলাওয়ার হোছাইন
তারাবীহ’র সালাত খুব দ্রুত ও তাড়াহুড়া করে পড়তে হবে, এটিই নিয়ম হয়ে গেছে আমাদের প্রত্যেকটি সমাজে। শৈশবের যখন থেকে তারাবীহ সালাত পড়ে আসছি এই নামাজটিকে দ্রুততার সাথেই আদায় করতে দেখে আসছি। কোনো কোনো ইমাম সাহেব এত দ্রুতবেগে তারাবীহ পড়ান  যে, পিছনের মুক্তাদিদের অবস্থা কাহিল হয়ে যায়। তারা শুধু উঠতে আর বসতে থাকে । কেউ কেউ রুকু থেকে সরাসরি সিজদায় চলে যায় দাঁড়ানোর সুযোগ পর্যন্ত পায়না। আমার ছোটকালে একবার এলাকার মসজিদে তারাবীহ পড়তে গিয়ে এক হাস্যকর অবস্থা সৃষ্টি হয়ে ছিল, কোনোভাবেই আমি ইমামের সাথে একত্র হতে পারছিলাম আমি সালাম ফিরিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ইমাম রুকুতে চলে গেল রুকু থেকে সিজদায় সিজদা থেকে আরেক সিজদায় শেষ পর্যন্ত সালামের পূর্ব মুহূর্তে শেষ বৈঠকে তাঁর সাথে কোনোমতে একত্রিত হতে সক্ষম হয়েছিলাম। সম্প্রতি ফেইসবুকে তারাবীহ সালাতের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, ইমাম সেখানে এত দ্রুত গতিতে তারাবীহ পড়াচ্ছে মনে হচ্ছে ইমামকে জ্বিনে ধরেছে বা সে এ ধরনের কোনো রোগে আক্রান্ত হয়েছে। কোথাও সেই থামছেনা, আর মুক্তাদিরা তো পুরোই দিশেহারা। আমাদের সমাজের চিত্র পুরোপুরি এরকম না হলেও অনেকাংশে এর কাছাকাছি।
পবিত্র রমজানুল মোবারকে মহান আল্লাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নামাজ নিয়ে এরকম তামশা কখনো কাম্য নয়। সারাদিনের রোজা শেষে আমরা তারাবীহ সালাত আদায় করছি; কাকে দেখানোর জন্যে? আল্লাহকেই তো খুশি করার জন্য পড়ছি। তাহলে এত তাড়াহুড়া কিসের?  যদি আল্লাহ আমার ইবাদত কবুল না করেন তাহলে সময় ও কষ্ট উভয়ই তো বৃথা।
আল্লাহ এ ধরনের সালাত কবুল করবেন না। বরং এধরণের সালাত আদায়কারীদের  উদ্যেশ্য মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ভয়ংকর ধমক বাক্য উচ্চারণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,”অতএব জাহান্নাম সেসব নামাযীর জন্যে, যারা তাদের নামায সম্বন্ধে উদাসীন” । (সূরা মাউন) এ আয়াতের তাফসিরে মুফাস্সিরগণ বলেন, এখানে ঐসব লোকদের উদ্যেশ্য করা হয়েছে যারা সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে রুকু-সেজদা সঠিক নিয়মে আদায় করে না, শুধু উঠাবসা করে।
মুসনাদে আহমদের একটি বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চুরি হলো নামাজে চুরি করা।’ সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, নামাজে কীভাবে চুরি করা হয়? তিনি বললেন, যথাযথ নিয়মে রুকু-সেজদা আদায় না করা অথবা রুকু সিজদায় মেরুদন্ড স্থির না করা।
সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরিফে হযরত আবু হুরায়রা (রা) কর্তৃক একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, একবার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে তাশরীফ আনলেন, ইতোমধ্যে একজন লোক মসজিদে প্রবেশ করে নামাজ আদায় করলো। তারপর এসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সালাম করলো। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সালামের জবাব দিয়ে বললেনঃ তুমি ফিরে গিয়ে পূণরায় নামাজ আদায় কর, কারণ, তুমি নামাজ আদায় করনি, (অর্থাৎ তোমার নামাজ সঠিকভাবে আদায় হয়নি)। লোকটি আবার নামাজ আদায় করল এবং পুনরায় এসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম দিল। তিনি বললেনঃ আবার গিয়ে সালাত আদায় কর, কেননা, তুমি সালাত আদায় করনি। এভাবে সে তিনবার করল। তৃতীয়বারের পরে লোকটি বলল, সে মহান সত্তার শপথ! যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আমি এর চেয়ে সুন্দর করে সালাত আদায় করতে জানিনা। কাজেই, আপনি আমাকে শিখিয়ে দিন। তখন তিনি বললেনঃ যখন তুমি নামাজে দাঁড়াবে, তখন তাকবীর বলবে। তারপর কুরআন থেকে যতটুকু তোমার পক্ষে সহজ ততটুকু পড়বে। এরপর তুমি রুকু করবে। এতক্ষণ পর্যন্ত তুমি রুকুতে থাকবে যাতে রুকু অবস্থায় তোমার শরীরের অবস্থা পুরোপুরি প্রশান্ত হয়ে যায়। এরপর রুকু থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে ধীরস্থির ভাবে দাঁড়িয়ে যাবে। এরপর তুমি সিজদাতে যাবে, এতক্ষণ পর্যন্ত তুমি সিজদায় পড়ে থাকবে যে সিজদা অবস্থায় তুমি সম্পূর্ণ ধীরস্থির ও শান্ত হয়ে যাও। এরপর সিজদা হতে মাথা তুলে স্থির ভাবে বসবে। এভাবে তুমি তোমার পুরো নামাজ আদায় করবে।
এভাবে তারাবীহ সালাতে অনেক ইমাম সাহেব এতদ্রুত তিলাওয়াত করেন মুসল্লিরা অনেক কষ্ট করেও কিছুই বুঝতে পারেন না। এগুলো পবিত্র কোরআনের সাথে অবমাননার শামিল। কোরআন নাজিলের এই বরকতময় মাসে এসব কখনো কাম্য নয়। আল্লাহ এ ধরনের তিলাওয়াত কবুল করবেন না এবং এ ধরনের তিলাওয়াত দিয়ে নামাজ আদায় হবে না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তারতিলের সঙ্গে কোরআন তিলাওয়াত করো। অর্থাৎ ধীরস্থিরে ও বুঝে বুঝে কুরআন তেলাওয়াত কর। (সুরা : মুজ্জাম্মিল, আয়াত : ৪)
লেখক : মুফতি দিলাওয়ার হোছাইন
                  মুফতি ও সিনিয়র শিক্ষক
                  আজিজুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানা
                  রাজারকুল, রামু, কক্সবাজার।
আগেরামুতে মহিলার পর আরো এক সিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত
পরেকরোনা: সাংবাদিকদের জন্য প্রণোদনার আহ্বান নাসিমের