
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
রামু সহিংসতার ১১ বছর পূর্ণ হল আজ। পবিত্র কুরআন শরিফ অবমাননার অভিযোগে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রামুর ১২টি বৌদ্ধমন্দিরে আগুন এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বাড়ি-ঘরে হামলা চালায় দুষ্কৃতকারীরা। এ ঘটনায় ১৮টি মামলা হলেও কোনোটিরই বিচার হয়নি। আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হলেও সাক্ষীর অভাবে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া প্রাথমিক পর্যায়ে থমকে আছে।
স্বাক্ষীরা জানেন না মামলার আসামী কারা! তারা মামলার এজাহারভুক্ত আসামীদেরও চিনেন না,ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল নাশকতাকারীরা,প্ৰকৃত অপরাধীরা আসামি না হওয়ায় সাক্ষী দিতে নারাজ সাক্ষীরা।
উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের উখিয়ারঘোনা জৈতবন বৌদ্ধ বিহার অগ্নিসংযোগ মামলার স্বাক্ষী পুনর্ধন বড়ুয়া বলেন, ২০১২ সালের এই ভয়াল হামলার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন সেই সুবাধে মামলার স্বাক্ষী হিসাবে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ ১১ বছর বছর অতিবাহিত হলেও অদ্যবদি আদালতের পক্ষ থেকে তাকে স্বাক্ষ গ্রহনে এখনও পর্যন্ত কোন নোটিশ বা যোগাযোগ করা হয়নি। তিনি ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী হলেও প্রকৃত অপরাধীদের মামলার আসামী করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন।
অপরদিকে একই মন্দির হামলার অভিযোগে এজাহার ভুক্ত আসামী আবু তালেব অনেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আমাকে বিনাদোষে উদ্দেশ্য প্রনোদিত ভাবে মন্দিরে অগ্নিসংযোগের ৩১৪ নং মামলার আসামি করা হয়। ২০১২ সাল থেকে দীর্ঘ ১১টি বছর মামলা চালিয়ে যাচ্ছি। উক্ত মামলায় আমরা প্রায় ৭৫ জন আসামী রয়েছি, মামলা মাঝেমধ্যে কোর্ট পরিবর্তন হয়, কিন্তু কোন সাক্ষী এখনো পর্যন্ত আদালতে হাজির হয়নি। যার ফলে মামলার কার্যক্রমও এগুচ্ছে না। যা আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর। আমরা চাই দ্রুত এই মামলা নিষ্পত্তি হউক।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম বলেন, বৌদ্ধবিহার ও বসতিতে হামলার ঘটনায় ১৯টি মামলা হয়। এরমধ্যে বাদীর সম্মতিতে একটি প্রত্যাহার করা হয়। ১৮টি মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলছে। ১১ বছরে বৌদ্ধদের মাঝে ফিরেছে সম্প্রীতি। দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাশৈলীতে পুণ্যার্থীদের পাশাপাশি বেড়েছে পর্যটকও। ক্ষতিগ্রস্তরা পেয়েছেন নতুন ঘর। বিভিন্ন বিহারে নিরাপত্তায় রয়েছে পুলিশ। সম্প্রীতি ফিরে আসায় খুশি বৌদ্ধরা। তবে বিচার প্রক্রিয়ার অচলাবস্থা নিয়ে তাদের মাঝে অসন্তোষ রয়েছে। অপরাধীরা আইনের আওতায় না আসায় তাদের শঙ্কা কাটছে না।
এদিকে বিভীষিকাময় দিনটির স্মরনে রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদ শুক্রবার দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করবে। ‘লাল চিং ও মৈত্রী বিহার’ প্রাঙ্গণে স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে প্রধান ধর্মদেশক হিসাবে থাকবেন গহিরা জেতবনারাম বিহারের ভদন্ত সত্যপাল মহাথেরো। মহতী অনুষ্টানে সভাপতিত্ব করবেন উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামমিত্র বন বিহারের অধ্যক্ষ ভদন্ত বিজয় রক্ষিত মহাথেরো। ভোরে বুদ্ধপূজা, সকালে জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, অষ্ট পরিষ্কার দানসহ মহাসংঘদান, দুপুরে মানববন্ধন, বিকালে হাজার প্রদীপ প্রজ্বালন ও সন্ধ্যায় বিশ্ব শান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে।
রামু সীমাবিহার পরিচালনা কমিটির নেতৃবৃন্দরা জানান, রামুতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরে এসেছে। আমরা দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধবিহার পেয়েছি। কিন্তু এগার বছরেও মামলার কার্যক্রম প্রাথমিক পর্যায়েই থমকে আছে। তারা আরও জানান, রামুতে ১৮টি মামলার বাদীই পুলিশ। পুলিশ কাকে আসামি করেছে, কাকে বাদ দিয়েছে তা কিছুই বৌদ্ধরা জানেন না। রামুতে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক সুমথ বড়ুয়া জানান, ১১টি বছর কেটে গেল। অথচ আসামিদের আইনের আওতায় আনা হলো না।
ওই রাতে হাজার হাজার মানুষকে শান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন তৎকালীন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সোহেল সরওয়ার কাজল। চোখের সামনে নিজ এলাকার হাজার বছরের স্মৃতি পুড়ে যেতে দেখেছিলেন তিনি। তিনি জানান, সেদিনের সেই ঘটনা আমাদের সকলকে নাড়া দিয়েছিল। সেই ভয়াবহ দিনের কথা আমরা ভুলতে পারিনি। আগামীতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সে ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি।
উল্লেখ্য রামুর হাইটুপী গ্রামের সুদত্ত বড়ুয়ার ছেলে উত্তম কুমার বড়ুয়ার ফেসবুকে পোস্ট করা ছবি নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ১২টি মন্দির ও ৩০টি ঘর পুড়িয়ে দেয় দুষ্কৃতকারীরা। এতে কয়েকশ বছরের প্রাচীন নিদর্শন পুড়ে যায়। টেকনাফ, উখিয়া ও পটিয়াতেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুড়ে যাওয়া বৌদ্ধবিহার ও বাড়িঘর পরবর্তী সময়ে সরকার নির্মাণ করে দেয়। দ্রুত বিচারের আশ্বাসও দেওয়া হয়।













