ফিরে দেখা ভয়াল ২৯ এপ্রিল’১৯৯১ইং…

0
4

হাফেজ মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর

ভয়াবহতা অনুভব করার মতো বয়স তখন আমার হয়নি। মাত্র ৬-৭ বছরের শিশু। প্রমোশনে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র। ১৯৯১সালের ২৯ এপ্রিল। মা অন্যান্য দিনের চেয়ে দ্রুত বাড়িতে বাড়ি ফেরার জন্য তাগাদা দিতে লাগলেন। কারণ রাতে তুফানের সিগন্যাল জারি করা হয়েছে। অতকিছু বুঝে উঠতে না পারলেও আকাশের প্রগাঢ় মেঘাচ্ছন্নতা, কিছুক্ষণ পর পর বিজলির ঝিলিক, বজ্রের গর্জন ইত্যাদি বৈরিতার কারণে মনে ভীতির সঞ্চার হয়। ফলে সেদিনের মতো খেলাধুলা শেষ করে বাড়িতে ছুটে আসি। মা প্রথমেই ভাই-বোন সকলকে পড়তে বসিয়ে দিলেন। তিনি রান্নার কাজে মশগুল। বাবা আছেন বাণিজ্যিক কাজে দূর সফরে। ক্রমশ রাত বাড়ছে। পবিত্র এশার নামাজের সময় হয়েছে। মাঝে মাঝে ধমকা হাওয়া বইছে। কখনো আবার বজ্রগর্জনসহ বিজলির চমক। আমরা একদিকে ভীত সন্ত্রস্ত হচ্ছি, আবার শিশুসূলভ দূরন্তপনাহেতু বাইরে গিয়ে আম কুড়ানোরও ফিকির করছি। কিন্তু সাহস হচ্ছিলনা মা’র বকুনি এবং আবহাওয়ার বৈরিতার কারণে। আবার এমন ঝড়-তুফানের সিগন্যালের মাঝেও বাবা বাড়ি ফিরেননি এখনো সেজন্য মা যেমন চিন্তিত আমরাও বিষন্ন। রাত যতই বাড়ছিল বাতাসের তীব্রতা ততই প্রবল হচ্ছিল। বর্তমান বাড়িটি তখন নির্মাণাধীন। পকুরের পূর্বপাড়ে বাঁশের বেষ্টনী ও কড়ের ছাউনীর ছোট্ট কুটিরে মমতাময়ী আমাদের নিয়ে গভীর শঙ্কায় অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। বাবাতো এখনো আসেননি। তারপরও মা আমাদের অভয় দিয়ে বলছিলেন তোমরা আল্লাহ আল্লাহ করো ইনশাআল্লাহ বিপদ থেকে আল্লাহ হেফাজত করবেন। আমরা তা-ই করছিলাম। একপর্যায়ে রান্নাঘর থেকে মায়ের দরদী ডাক ভেসে আসলো ‘তোমরা তাড়াতাড়ি খাবার খেয়ে নাও। অবস্থা তেমন ভালো না।’ আমরাও খানা শুরু করলাম তুফানের গতিবেগও দ্রুত বাড়তে লাগলো আমার বড়বোন এবং ছোট ভাই-বোনেরা ভয়ে খাবারের প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়ে। কিন্তু আমি অতকিছু আচ করার চেয়ে মায়ের তাগাদার কারণে খানা শেষ করার কর্তব্য সম্পাদনেই বেশী মনোযোগী ছিলাম। ডাল আর ডিম দিয়ে মায়ের মমতসিক্ত খাবার খাওয়ার এক পর্যায়ে বাইর থেকে মা’র উদ্দেশ্যে বাবার ডাক ভেসে আসলো ‘আমার সন্তানদের নিয়ে তুমি এখনো এই কুটিরে কি করছো! অবস্থাতো মোটেও ভালো না।’ এরপর যে যে অবস্থায় আছি আমাদেরকে কাউকে কাঁধে, কাউকে কুলে করে এমন বিদঘুটে অন্ধকার ও প্রবল বাতাসের মাঝেও বাবা ছুটে চললেন নির্মাণাধীন বাড়ির দিকে। তখন রাত কয়টা তা আমার মনে নেই। আমরা স্থানান্তরিত হওয়ার পর যথারীতি অবশিষ্ট খাবার শেষ করেছিলাম।
এদিকে ঝড়ের তীব্রতা বাড়ছে, আর আমাদের ওপর ঘুমানোর তাগাদা। বাবা-মা ব্যস্ত আমাদের নিরাপদে রাখার তদবিরে। আমি কিছুক্ষণ পর পর জেগে উঠে মা’র কাছে জানতে চাই মা তুফান থেমেছে?এভাবে গভীর শঙ্কা আর উৎকন্ঠায় ভয়াবহ সে রাতটি পার হলো। সকালে আরেক ভিন্ন আবহ। ভিটে-মাটির ওপর এলোমেলোভাবে পড়ে আছে গাছ-পালা। গ্রামের চেহারাই আলাদা। বয়স কম হওয়ার কারণে বাইরের ভয়াবহতা সম্পর্কে তেমন কিছু জানার সুযোগ না হলেও গ্রামের বিধ্বস্ত-বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে কিছুটা অনুভব করতে পেরেছিলাম। সে রাতের ভয়াবহতায় অনেক নিষ্পাপ শিশুরা হারিয়েছে তাদের মা-বাবাকে। অনেক মা-বাবা হারিয়েছেন তাঁদের আদরের সন্তান, অনেকে স্বামী, অনেকে হারিয়েছেন স্ত্রী, বহুজন হারিয়েছেন আত্মীয় স্বজন। অনেকে বাড়িঘর, ভিটে-মাটি, সহায় সম্পদ হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। আজ সে ভয়াবহ রাতের প্রতিকুলতায় উপকুলীয় অঞ্চলের মৃত্যুবরণকারীদের শাহাদতের মর্যাদা কামনা করি। যাঁরা সে রাতের ভয়াবহ স্মৃতিকে ফেরী করে পথচলছেন তাদের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা। আল্লাহ আমাদেরকে সে রকম দূর্যোগ-দূর্বিপাক থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

লেখক
সভাপতি
রামু লেখক ফোরাম।

আগেরামুর রাবার বাগানে বন্দুকযুদ্ধে রোহিঙ্গা ইয়াবা ব্যবসায়ী নিহত: ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধার
পরেনির্মূল হবে না করোনা, প্রতি বছর ফিরবে নতুন রূপে: চীনা গবেষণা