
বহুল আলোচিত কক্সবাজারে পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার ঘোষিত রায়ে সাবেক ওসি প্রদীপ ও লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৬ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে অপর সাতজনকে বেখসুর খালাস দিয়েছেন। এ রায় ঘোষণার জন্য আদালত মামলার তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদন, সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দীতে আদালত রায় ঘোষণার জন্য পাঁচটি বিষয় বিবেচনায় নিয়েছেন। সিনহা হত্যা মামলায় তার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌসের করা মামলাটিতে ৮৫ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬৫ জনের সাক্ষ্য নেন আদালত।
সোমবার (৩১ জানুয়ারি) বিকেলে ৪টা ১৫ মিনিটে কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইলের আদালত এসব বিষয় বিবেচনায় নেন। এসময় আদালত বলেছেন, ‘সিনহা হত্যাকাণ্ড পূর্ব পরিকল্পিত। হত্যাকাণ্ডটি শুরু থেকেই খটকা লেগেছিল। আমি মেজর সিনহা হত্যা মামলাটি বিভিন ইস্যু খুঁটিনাটি খোঁজার চেষ্টা করেছি। এতে এপিবিএন ৩জন সদস্য দায়িত্বে ছিলেন। এ তিনজনই প্রথমে সিনহার গাড়িটি আটকানোর পর ছেড়ে দিলেও পুলিশ কি কারণে পুনরায় আটকালেন এবং ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে গুলি করা হয়। এতে প্রমাণিত হয় সিনহা হত্যা একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।’
সিনহা হত্যা মামলার রায় ঘোষণার জন্য আদালত যে পাঁচটি বিষয়কে বিবেচনায় নিয়েছেন তা হলো—
এক. অত্র মামলার আসামিগণ পরস্পর এক ও অভিন্ন অসৎ উদ্দেশ্যে মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে হত্যা করার অপরাধ সংঘটন করার লক্ষ্যে অপরাধজনক ষড়যন্ত্র করেছে কিনা?
দুই. অত্র মামলার আসামিগণ মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে হত্যা করার এক ও অভিন্ন অসৎ উদ্দেশ্যে পরস্পর অপরাধজনক ষড়যন্ত্রে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে পূর্ব পরিকল্পনামতে উক্ত মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে হত্যা করিয়েছে কিনা?
তিন. উক্ত মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে হত্যা করে সংঘটিত হত্যার অপরাধের দায় থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে ও ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে মিথ্যা মামলা সৃষ্টি ও মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত ধ্বংস করেছে কিনা?
চার. অত্র মামলার আসামিগণ আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হয়েও অর্পিত ক্ষমতা ও অস্ত্র বেআইনিভাবে অসৎ উদ্দেশ্যে অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার করেছে কিনা?
পাঁচ. অত্র মামলার আসামিগণ কর্তৃপক্ষের আইন বহির্ভূত আদেশের বিষয়ে জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও অসৎ উদ্দেশ্যে পরস্পর যোগসাজশে অপরাধজনক ষড়যন্ত্রে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে উক্ত অবৈধ আদেশ পালন করেছে কিনা?
এই পাঁচ বিষয়ের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে দণ্ডিত আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/১০৯/১১৪/১২০-বি/৩৪ ধারার অপরাধের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করিতে সক্ষম হয় বলে জানান আদালত।
এরআগে সোমবার (৩১ জানুয়ারি) বিকেলে ৪টা ১৫ মিনিটে কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইলের আদালতে ঘোষিত রায়ে প্রধান আসামি বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া অন্য ছয় আসামিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও সাত জনকে বেখসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
যাবজ্জীবনপ্রাপ্তরা হলেন— টেকনাফ থানার এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল রুবেল শর্মা, কনস্টেবল সাগর দেব ও টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন।
খালাসপ্রাপ্তরা হলেন— এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ ও বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া।
এরআগে দুপুর ২ টা ৫০ মিনিট থেকে ৩০০ পৃষ্টার রায়ের সার সংক্ষেপ পড়া শুরু করেন বিচারক। রায় ঘোষণার সময় এজলাসে উপস্থিত ছিলেন ওসি প্রদীপসহ মামলার ১৫ আসামি।
রায় ঘোষণার সময় আদালত বলেছেন— সিনহা হত্যাকাণ্ড পূর্ব পরিকল্পিত। হত্যাকাণ্ডটি শুরু থেকেই খটকা লেগেছিল। সিনহার পরিচয় জানার পর স্যালুট দিয়েছিলেন চেকপোস্টে থাকা সদস্যরা। এর একটু পর তাঁরাই কেন আবার গুলি করতে সহযোগিতা করলেন। এ কারণেই এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
গত ১২ জানুয়ারি আসামি ওসি প্রদীপের আইনজীবীর অসমাপ্ত যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায় ঘোষণার জন্য এ দিন ধার্য করেন। রায় ঘোষণার জন্য দুপুরে পৌনে ২টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ওসি প্রদীপসহ এ মামলার ১৫ আসামিকে আদালতে আনা হয়। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে আদালতপাড়ায় সাধারণ মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত রয়েছেন সিনহার মা-বোনসহ বাদী ও বিবাদী পক্ষের স্বজনরা।
মামলার চার্জশিটভুক্ত ১৫ আসামি হলেন— বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, কনস্টেবল রুবেল শর্মা, টেকনাফ থানার এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুল করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, কনস্টেবল সাগর দেব, এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ, টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন। এদের মধ্যে পুলিশের সকল সদস্যকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর বাহারছড়া চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনার পাঁচ দিন পর ওই বছরের ৫ আগস্ট নিহত সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে বাহারছড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের তৎকালীন ইনচার্জ লিয়াকত আলীকে প্রধান আসামি এবং টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশকে দ্বিতীয় আসামি করে ৯ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় র্যাব।
৪ মাসের বেশি সময় ধরে চলা তদন্তের পর ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে ‘পরিকল্পিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০২১ সালের ২৭ জুন ১৫ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। এরপর ২৩ আগস্ট কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইলের আদালতে সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ এবং জেরা শুরু হয়। এ প্রক্রিয়া শেষ হয় গত ১ ডিসেম্বর। এ মামলায় মোট ৬৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।-সিভয়েস













