
হাফেজ মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর
ঐতিহ্যবাহী বাঁকখালী নদীর তীরে নিবিড় ছায়াঘেরা প্রাকৃতিক শিল্পশোভায় অনন্য সুন্দর একটি গ্রাম লম্বরীপাড়া। এতদঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্যসমৃদ্ধ প্রাচীন জনপদ রামু উপজেলার প্রাণকেন্দ্র ফতেখাঁরকুলেই আমাদের স্মৃতিবিজড়িত এ গ্রামের অবস্থান। বহু গুণীজনের জন্ম ও পদচারণায় ধন্য আমাদের গ্রামের মাটি। তাই-তো ছোটবেলা থেকেই “লম্বরীপাড়া হবে “আলোকিত মানুষদের গ্রাম” এমনটাই ছিল প্রত্যাশা। সেই শৈশব-কৈশর থেকেই স্বপ্ন লালন করতাম একটি আলোকিত সমাজ গড়ার। স্বপ্ন লালন করতাম মানবিক সমাজ বিনির্মাণের। কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান আহরণের সুবাদে সেই স্বপ্ন ও প্রত্যাশা বাস্তবায়নের দায়িত্বোধ বাড়তে থাকে ক্রমশ। ফলশ্রুতিতে ২০০৬ সালের শেষ দিকে বেশ ক’জন আদর্শ তরুণকে সাথে নিয়ে লম্বরীপাড়া ইসলামী পাঠাগার নামে শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারমূলক একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলাম। এ পাঠাগারের কয়েকবছর ধারাবাহিক কার্যক্রমে এলাকায় একটি পরিবর্তনের শুভ সূচনা হয়েছিল। কিন্তু নানা প্রতিকুলতায় পাঠাগারটির গঠনমূলক তৎপরতার ধারাবাহিকতা আর বজায় থাকেনি। ফলে আবারো ধীরে ধীরে এলাকায় নানা অসঙ্গতি ও অপরাধের কালো ছায়া বিস্তৃত হচ্ছিল। নিরবে মাথাচড়া দিয়ে উঠছিল অপরাধীরা। মুষ্টিমেয় কতিপয় অসাধু, অপরাধীর কারণে পুরো গ্রামের ভাবমর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হতে চলেছিল। বিপন্ন হতে চলেছিল এলাকার সামাজিক পরিবেশ।
নিজেদের গ্রামের ওপর অপরাধীরা এমন নগ্নথাবা বিস্তার করে বসবে আর আমরা নিরব বসে থাকবো তা কখনোই হতে পারেনা। আল্লাহ তা’আলা কুরআনুল কারীমে নির্দেশ দিয়েছেন ” তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিৎ যারা আহবান করবে কল্যাণের পথে, নির্দেশ দেবে সৎ কাজের, বারণ করবে অসৎ কাজ থেকে । আর তারাই সফলকাম।” ( সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১০৪)। সকল অন্যায়-অনাচার প্রতিরোধে রাসুলে কারীম স.ও সুস্পষ্টভাবে নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
অপরাধমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ এবং বিশ্বনবী হযরত রাসুলে কারীম স. এর শাশ্বত আদর্শ বাস্তবায়নের দৃঢ় সঙ্কল্প নিয়ে গত বছরের ২৮ জুন এলাকার ওলামায়েকেরাম ও যুবসমাজের পৃথক পৃথক সভা আহবান করি। উভয় সভায় আমন্ত্রিত প্রায় সকলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেন। সেদিন সকালে এলাকার সকল ওলামায়েকেরামের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় আলেকিত সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বৃহত্তর লম্বরীপাড়া ওলামা ও ইমাম পরিষদ গঠিত হয়। একই দিন বাদ এশা গ্রামের আদর্শিকধারার প্রতিশ্রুতিশীল যুবক-তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় এক প্রাণবন্ত মতবিনিময় সভা। সে সভায় সর্বস্মতিক্রমে মাদক ও অপরাধ নির্মূল করে আলোকিত সমাজ গড়ার দৃপ্ত শপথে “আলোর দিশারী যুব পরিষদ লম্বরীপাড়া” নামে একটি তারুণ্যদীপ্ত সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১ জুলাই অনুষ্ঠিত আরেকটি যুবসমাবেশে প্রথম সভার সিদ্ধান্তসমূহ সর্বসম্মতিক্রমে চুড়ান্ত হয়। এরই আলোকে এলাকার শিক্ষানুরাগী, সমাজসচেতন ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে উপদেষ্টা পরিষদ এবং উদ্যমী, আদর্শিক তরুণদের সমন্বয়ে কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠনের মধ্যদিয়ে সংগঠনটির প্রাথমিক অভিযাত্রার শুভ সূচনা হয়। পথচলা শুরু করেই সাংগঠনিক কার্যক্রম সুচারুরূপে পরিচালনার ব্রত নিয়ে ১২ জুলাই এলাকার সর্বস্তরের যুবসমাজের ব্যাপক উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ অধিবেশন। এর পরপরই গ্রামের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকল্পে আলেম সমাজ, মুরুব্বী সমাজসহ বিভিন্ন মহলের সাথে পৃথক পৃথক মতবিনিময় সভা আয়োজন করা হয়। সেই সাথে রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহোদয়, রামু থানার অফিসার ইনচার্জ ( ওসি), ওসি ( তদন্ত), ফতেখাঁরকুল ইউপি চেয়ারম্যান, স্থানীয় ইউপি সদস্যের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে সংগঠনের লক্ষ্য -উদ্দেশ্য ও পরিচিতি তুলেন দায়িত্বশীলবৃন্দ। ১৬ আগষ্ট লম্বরীপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মিলনায়তনে ব্যাপক আয়োজনের মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠিত হয় সংগঠনটির উদ্যোগে প্রথমবারের মত সর্ববৃহৎ ও যুগান্তকারী আয়োজন আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়ন বিষয়ক সভা। এ সমাবেশে রামু থানার সম্মানিত অফিসার ইনচার্জ ( ওসি) আবুল খাইর, আমাদের এলাকার কৃতি সন্তান বান্দরবান সরকারী কলেজের অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম, ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফরিদুল আলমসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তা , জনপ্রতিনিধি, সামাজিক নেতৃবৃন্দসহ এলাকার সর্বস্তরের জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহন করেন। সমাবেশে অপরাধীদের প্রতি যে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ এবং জনসচেতনতামূলক আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে তাতে করে একটি ইতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পুড়ে এলাকাজুড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, মাদক সেবনকারী ও অপরাধীদের গ্রেফতার ও শাস্তির আওতায় আনতে সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে কৌশলী সহযোগিতা করা হয়। অশ্লীলতা, বেহায়পনা প্রতিরোধে পালন করা হয় বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা। এছাড়াও ৯ আগষ্ট এডিস মশা প্রতিরোধে সরকার ঘোষিত কর্মসূচীর আওতায় রামু লম্বরীপাড়া দারুল কুরআন নূরানী একাডেমী পরিচালিত পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নেন, সংগঠনের সদস্যরা। ইতোমধ্যে করোনাভাইরাস জনিত সঙ্কট উত্তরণে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে গত ৩ এপ্রিল পুরো এলাকায় স্বেচ্ছাশ্রমে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা, জীবাণুনাশক স্প্রে এবং জনসচেতনতামূলক পোস্টারিং করা হয়। মসজিদে মসজিদে সরবরাহ করা হয় সাবান, ফ্লোর ক্লিনারসহ পরিচ্ছন্নতা সরঞ্জামাদি। এরপরে ১০ এপ্রিল করোনাজনিত সঙ্কটে সদস্যদের স্বেচ্ছাদানে অর্ধ লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ে দরিদ্র-অসহায় ১৩৮ টি পরিবারকে ঘরে ঘরে গিয়ে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেয়া হয়। গ্রামের দু’টি কবরস্থান এবং মল্লনের বিলে অবস্থিত দীর্ঘদিনের অরক্ষিত প্রাচীন কবরস্থানের পবিত্রতা রক্ষায় সাইনবোর্ড স্থাপন, অন্ধকারাচ্ছন্ন স্পটে লাইটিং ইত্যাদি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হয়।
এভাবে হাটি হাটি পা পা করে গঠনমূলক মানবিক, সমাজিক কর্মসূচী বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে আল্লাহর রহমতে স্বেচ্ছাসেবী এ সামাজিক সংগঠন আজ পথচলার এক বছর পূর্ণ করেছে আলহামদুলিল্লাহ।













