
সিভয়েস ডেস্কঃ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় গ্রেপ্তার সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের চারজনের বাবাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী। বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারীর সন্তান হওয়ার সুবাদে ক্যাম্পাস এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে তাদের ছিল নিজস্ব সিন্ডিকেট।
গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে চবির ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আজিমের বাবা সমাজবিজ্ঞান অনুষদের মালি। তারা থাকেন ক্যাম্পাসের ইসলামিয়া কলোনিতে। রাজনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের অনুসারি এবং বগিভিত্তিক গ্রুপ সিএফসির সঙ্গে জড়িত। সিএফসি চট্টগ্রামের ছাত্র রাজনীতিতে চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য এবং শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারি হিসেবে পরিচিত। যদিও শিক্ষা উপমন্ত্রী বারবার তার কোন গ্রুপ নেই বলে দাবি করে আসছিলেন।

চবি ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের সঙ্গে তোলা ছবি দিয়ে গ্রেপ্তার আজিমের ফেসবুক স্ট্যাটাস।
অন্যদিকে বাকি তিনজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বগিভিত্তিক গ্রুপ ভিএক্স ও ছাত্রলীগ নেতা প্রদীপ চক্রবর্তী দুর্জয়ের অনুসারি। চট্টগ্রামের ছাত্র রাজনীতিতে দুর্জয় নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরের অনুসারি হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে বাবু ক্যাম্পাসের বিজ্ঞান অনুষদের পাশে হিলবটম কলোনির বাসিন্দা। তার বাবা বেলায়েত হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রহরী। শাওন ক্যাম্পাসের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের তিন নম্বর গোডাউন কলোনির বাসিন্দা। তার বাবা জাবেদ হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী। মাসুদও তিন নম্বর গোডাউন কলোনির বাসিন্দা। তার বাবা মো. মান্নান ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী।

বাবুর সাথে প্রদীপ চক্রবর্তী দুর্জয়ের ছবি
পলাতক সাইফুল হোসেন নামে দুইজনের মধ্যে একজন সাইফুলের বাসা মূল হোতা আজিমের এলাকা ইসলামিয়া কলোনিতে। আরেক সাইফুল তিন নম্বর গোডাউন এলাকার। দুইজনের বাবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী। স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে তাদের একটি ‘সিন্ডিকেট’আছে। ক্যাম্পাসে তাদের এক সাথে ঘুরতে দেখা যায়। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বিভিন্ন অপকর্মে তারা লিপ্ত বলে জানা গেছে।

ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে অভিযুক্তরা
এদিকে আজিম নিজের কর্মী নয় বলে দাবি করেছেন ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল। তিনি সিভয়েসকে বলেন, ‘আমাকে মিডিয়া ট্রায়াল করা হয়েছে। এতদিন সবাই বলছে জড়িতরা সবাই আমার কর্মী। আজ প্রমাণ পেলো তারা কারা। সত্যের বিজয় হয়েছে।’
যদিও রুবেলের সঙ্গে ঘটনার মূল হোতা আজিমের একই প্রাইভেট কারে ঘুরে বেড়ানোর ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যেখানে রুবেলের ছায়াতলে নিজেকে নিরাপদবোধ মনে করেন জানিয়ে তিনি লিখেছিলেন,‘যার ছায়াতলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের প্রতিটা নেতা-কর্মী , এগিয়ে যান ভাই আমার, আমরা তো আছি ভয় কিসের।’
এ বিষয়ে সুমন নাসির সিভয়েসকে বলেন, ‘আজিম আমাদের প্রোগ্রামে আসতো। তবে সেই অপরাধী, তার কোনো দল নেই। তাকে সর্বচ্ছো শাস্তি দেয়া হোক।’
বাবু, শাওন, মাসুদের ব্যাপারে ছাত্রলীগের ভিএক্স গ্রুপের নেতা প্রদীপ চক্রবর্তী দুর্জয় বলেন, ‘অভিযুক্ত দুইজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়। তারা কিভাবে আমাদের কর্মী হবে? তারা ক্যাম্পাসের পাশে থাকে এবং তাদের বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী। সে হিসেবে কখনো হয়তো আমাদের সাথে ছবি তুলে থাকতে পারে। এটা নিয়ে অপরাজনীতি করার সুযোগ নেই। অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি আমরা প্রথম থেকে দাবি করছে।’

অভিযুক্তরা একসঙ্গে ক্যাম্পাসে দিতেন আড্ডা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা অপরাজনীতি করছে তাদেরকে বলবো আপনারা এগুলো বন্ধ করুন। অপরাধীদের কোনো দল নেই। যারা এ ঘটনায় জড়িত তাদের অবিলম্বে শাস্তি নিশ্চিত করছে প্রশাসনকে আহ্বান জানাবো- যোগ করেন দুর্জয়।
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু বলেন, ‘অপরাধীদের অপরাধ হাইলাইটস করুন, একটা সংগঠনকে নয়। যারা অপরাধ করছে তাদের ছাত্রলীগের কোনো সাংগঠনিক পরিচয় নেই। তারা ছাত্রলীগের কর্মী হতে পারে না।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কর্মীদের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন হয়রানি ও হেনস্তার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসের ভেতরেই ছাত্রলীগের চার কর্মীর বিরুদ্ধে দুই ছাত্রীকে হেনস্তার অভিযোগ উঠে।
গত জুন ও এপ্রিল মাসে শাটল ট্রেনে বহিরাগত কয়েকজন দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। ছাত্রলীগ কর্মী-বহিরাগতদের হাতে শিক্ষার্থীরা বারংবার যৌন নিপীড়ন ও হেনস্তার শিকার হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার বলেন, ‘যৌন হয়রানির ঘটনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ছাত্র জড়িত তাদের আজীবন বহিষ্কার করা হবে।’
এর আগে গত ১৭ জুলাই ক্যাম্পাসে এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠে পাঁচ তরুণের বিরুদ্ধে। পরে এ বিষয়ে ভুক্তভোগী প্রক্টর বরাবর অভিযোগ দিলে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রশাসন। পরে হেনস্তার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারের দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।











