
ওয়াহিদ রুবেল/আরমান:
উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মতে কক্সবাজারের প্রাণ হিসেবে পরিচিত ‘বাঁকখালী নদী’তে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে গঠিত টাস্ক ফোর্স। মঙ্গলবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে কস্তুরা ঘাট এলাকায় এ অভিযান শুরু করা হয়। প্রথম দিনে বিকেল পর্যন্ত শতাধিক আধাপাকা স্থাপনা, সীমানা দেয়া গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আবু সুফিয়ান।
তিনি বলেন, নদীর তীর দখলমুক্ত করতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। সেই নির্দেশনার আলোকে সোমবার দখলদারদের মালামাল ও স্থাপনা স্ব স্ব উদ্যোগে সরিয়ে নিতে অনুরোধ জানিয়েছে মাইকিং করা হয়। আজ মঙ্গলবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল হতে বাঁকখালী তীরের কস্তুোরাঘাট এলাকা দখলমুক্ত করতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। দুপুর পর্যন্ত চলা অভিযানে নির্মিতব্য বেশ কয়েকটি আধাপাকা স্থাপণা গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ভেঙে ফেলা হয়েছে বেশ কয়েকটি প্লটের সীমানা দেয়ালও। অন্যান্য স্থাপনা মিলে প্রায় শতাধিক স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
দখল উচ্ছেদ চলাকালীন সময় দখলদার আব্দুল খালেক প্রকাশ খালেক চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সাংবাদিক ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপর হামলা চালানো হয়।
এদিকে বাঁকখালী নদী দখলে জড়িত ১৩১ জনকে চিহ্নিত করে পৃথক প্রতিবেদন তৈরি করেছে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তর, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও বিআইডব্লিউটি। নদীর অন্যান্য স্থানের পাশাপাশি কক্সবাজার পৌরসভার কস্তুরা ঘাট থেকে খুরুশকুল সংযোগ সেতুকে কেন্দ্র করে দখলের মহোৎসব শুরু হয়। যেখানে সরকারি দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক নামধারী ব্যক্তি ও প্রভাবশালী মিলে প্রায় ৫০ জনের নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে ২৩ জনের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দখলবাজদের থাবায় বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বাঁকখালী নদী। নদীর বুকের প্রায় ৬০০ হেক্টর প্যারাবন নিধন করে ইচ্ছেমতো তীর দখল করে চলছে ভরাট ও প্লট তৈরির কাজ। নির্মাণ করা হচ্ছে একের পর এক স্থাপনা। প্রশাসন, বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদফতর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে দখলের এ মহোৎসব চললেও তা বন্ধে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেইনি সংশ্লিষ্ট কেউ।
অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট দফতর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ম্যানেজ করেই দিনে-দুপুরে এসব দখল, বন ধ্বংস এবং স্থাপনা নির্মাণ চলেছে।
পরিবেশবাদি সংগঠন নেতৃবৃন্দের মতে, খুরুশকুলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য কস্তুরাঘাট পয়েন্টে বাঁকখালী নদীর ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে ৫৯৫ মিটার দৈর্ঘের একটি সেতু। সেতুটিই যেন বাঁকখালী নদী ও তীরবর্তী প্যারাবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেতুর জন্য সংযোগ সড়ক নির্মাণের সাথে পাল্লা দিয়ে সড়কের দুই পাশে প্যারাবন ধ্বংস করে নদী দখলের প্রতিযোগিতা চলছে। বালু ফেলে নদী ভরাট করা হচ্ছে। ভরাট জমিতে প্লট বানিয়ে বিক্রিও শুরু হয়েছে। এভাবে সংযোগ সড়কের পাশে প্রায় ৬’শ হেক্টর এলাকার প্যারাবন উজাড় করে তৈরি হয়েছে শতাধিক ঘরবাড়িসহ নানা স্থাপনা। প্রভাবশালীদের এ দখলযজ্ঞের পেছনে প্রশাসনের ভূমিকাও রহস্যজনক।
এদিকে, গত ২৪ জানুয়ারি বাঁকখালী নদী ও প্যারাবনের অবস্থা পরিদর্শনে যান বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। নদী দখল আর বন ধ্বংসের চিত্র দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি।
বিষয়টি আবারও আদালতের নজরে আনেন বেলা প্রধান। নদীর তীর দখলমুক্ত করতে উচ্চ আদালত আবারও নির্দেশনা দেন। সেই নির্দেশনার আলোকে বাঁকখালী নদী তীর পরিদর্শনে যান কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া, সহকারি কমিশনার (ভূমি) মো. জিল্লুর রহমান, পরিবেশ অধিদফতর, বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার দখলদারদের মালামালসহ সরে যেতে মাইকিং করা হয়। আজ মঙ্গলবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল হতে বাঁকখালী তীরের কস্তুোরাঘাট এলাকা দখলমুক্ত করতে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জাহিদ ইকবাল ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে চলা এ অভিযানে র্যাব, পুলিশ, পরিবেশ অধিদফতর, দমকল বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টরা অংশ নেয়।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জাহিদ ইকবাল বলেন, নদীর জীবন্ত সত্তাকে হত্যা ও বন নিধন চরম অমানবিকতা। মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নে এসব অবৈধ দখল যেকোন ভাবে উচ্ছেদ করা হবে। প্রথম দিন সকাল হতে শতাধিক স্থাপণা গুড়িয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছে। বাকি স্থাপনাও ক্রমে সরিয়ে ফেলা হবে।

বাঁকখালী দখলে যাদের নাম:
পরিবেশ অধিদপ্তর, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও বিআইডব্লিউটিএ’র পৃথক প্রতিবেদনে বাঁকখালী নদী দখলে জড়িত ১৩১ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তারা হলেন- শহরের বদরমোকাম এলাকার জসিম উদ্দিন, নতুন বাহারছড়ার গিয়াস উদ্দিন, ঝাউতলার মোহাম্মদ আলী মুন্না, নতুন বাহারছড়ার জনি, মেয়র মুজিবুর রহমান, বদর মোকাম এলাকার কফিল উদ্দিন এ্যানি, রুমালিয়ারছড়ার মো. ইসমাইল, ঝাউতলা এলাকার আনিস মোহাম্মদ টিপু, শাহীনুল হক, নেত্রকোনা থেকে আসা ওমর ফারুক, রামুর হেলালুর রশিদ, মাসেদুল হক রাশেদ, টেকনাফের মোহাম্মদ ইউনুচ বাঙ্গালী, শফিক মিয়া, ঝিলংজার নুরুল আলম, বাহারছড়ার শহীদুল হক, কাইসার, মেহেদী, নুরপাড়ার তায়েফ আহমদ, তাইছাদ সাব্বির, সিটি কলেজ এলাকার আবদুল মালেক ইমন,হোটেল তাজসেবার খাইরুল ইসলাম জিসান, পাহাড়তলীর আরিফুল ইসলাম, খুরুশকুলের নুরুল আমিন, মহেশখালীর কুতুবজোমের মেহেরিয়াপাড়ার রোকন উদ্দিন, মহেশখালী পৌরসভার চরপাড়ার মো. ইউসুফ, সাতকানিয়া কাঞ্চনার শরিফুল আলম চৌধুরী, মহেশখালী পুটিবিলা এলাকার জাহেদুল ইসলাম শিবলু, বদরমোকাম এলাকার মো. কামাল ওরেফে কামাল মাঝি, সাতকানিয়া পশ্চিম ডলুর জসিম উদ্দিন, বাঁশখালী চনুয়ার জিয়া মো. কলিম উল্লাহ, লোহাগাড়া চৌধুরীপাড়াস্থ উত্তর হরিয়া এলাকার খোরশেদ আলম চৌধুরী, মনোহরগনজয়ের দক্ষিন সরসপুর বাতাবাড়িয়া এলাকার ফিরোজ আহমদ, বদর মোকাম এলাকার মিজানুর রহমান, চট্টগ্রামের চাদগাঁও এলাকার মাহমুদুল করিম, কক্সবাজারের লালদিঘীপাড় এলাকার আশিক, কক্সবাজার সদর উপজেলার হাজীপাড়ার আমীর আলী, রামু চাকমারকুলের মোস্তফা কামাল, বৈল্যাপাড়ার আমিন, রুমালিয়ারছড়াস্থ এবিসি ঘোনা এলাকার মো. ইসলাম ওরফে খোল বাহাদুর, বদরমোকাম এলাকার মো. ইব্রাহীম, পানবাজার সড়কের মারুফ আদনান, কস্তুরাঘাটের ইশতিয়াক আহমেদ, ইকরা রিয়েল এস্টেট হাউজিং এর মালিক আমিনুল ইসলাম আমান, খুরুশকুল মনুপাড়ার মোহাম্মদ সেলিম প্রকাশ বার্মাইয়া সেলিম, কক্সবাজার শহরের হোটেল তাজসেবার মাহবুবুর রহমান, মধ্যম বাহারছড়ার মো. রানা, লালদীঘির পাড় এলাকার ঝুমা ও মহেশখালীর শাপলাপুরের দীনেশপুর এলাকার ইকবাল হাসান।













