কক্সবাজার জেলা কারাগারে অনিয়মই যেন নিয়ম

0
9

 

শাহেদ ফেরদৌস হিরু, কক্সবাজার:
কক্সবাজার জেলা কারাগারের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারের পর কয়েকজন কর্মকর্তার শাস্তিমূলক বদলি হলেও অনিয়ম ও দুর্নীতি যেন থামছেই না। অনিয়ম এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বন্দীদের অভিযোগের যেন শেষ নেই।

অভিযোগ উঠেছে, কক্সবাজার কারাগারে সিট বাণিজ্য, ওয়ার্ড বাণিজ্য, সেল বাণিজ্য, মোবাইল কল বাণিজ্য, সাক্ষাৎ বাণিজ্য ও বন্দীদের খাবার চড়া দামে কেন্টিনে বিক্রিসহ নানান অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রতিমাসে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন কক্সবাজার জেলা কারাগারের কারারক্ষী ও কর্মকর্তারা।

কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়া বেলাল উদ্দিন নামের এক যুবক বলেন, কারাগারে হাসপাতালের বেড পেতে হলে অসুস্থ হওয়া জরুরী নয়। কোন নিয়ম ও বিধি অনুসরনেরও প্রয়োজন নেই। দুই মাসের অগ্রিম ও প্রতিমাসে ১৫ হাজার টাকা দিলেই সুস্থ বন্দীদের দিয়ে দেয়া হয় কারা হসপিটালের বেড। আর অসুস্থ বন্দীরা কম্বল বিছিয়ে থাকেন মেঝেতে। কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোন রোগী যদি সাহস করে মুখ খোলে তাহলে তাদের উপর চলে নির্যাতন। এভাবে ৩০ জনের অধিক মাদক ব্যাবসায়ী ও প্রভাবশালীদের মাসের পর মাস মেডিকেলে রেখে সিট বাণিজ্যের মাধ্যমে কারা কর্তৃপক্ষ প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, শুধু তাই নয় কারাগারের হাসপাতালের বেডে থাকা ভিআইপিদের খাওয়া দাওয়াও বাহির থেকে আসে রাজকীয়ভাবে। কারা ফটকে দায়িত্বরত কারারক্ষীর সহযোগিতায় বাহির থেকে মেডিকেলে কিনে আসা হয় তরতাজা মাছ, মাংস, ফল ও সবজি। মেডিকেল চৌখার মাধ্যমে রান্না করে তাদেরকে সরবরাহ করা হয়। এবং এ ব্যাপারে তাদেরকে সবমময় সহযোগীতা করেন কারাগারের ফার্মাসিস্ট আব্দুল হামিদ।

ইসহাক নামের এক ব্যাক্তি জানান, তার ছেলে দীর্ঘ ২ বছর ধরে একটি মামলায় কারাগারে রয়েছে। ছেলের প্রতিমাসের চাহিদা মেটাতে নগদ টাকা প্রয়োজন হলে কারাগার কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিকাশে টাকা পাঠান তিনি। সেক্ষেত্রে বিকাশে প্রতি হাজারে কারা কর্তৃপক্ষকে কমিশন দিতে হয় ২’শ টাকা। অর্থাৎ ১ হাজার টাকা তার বন্দী ছেলের জন্য পাঠালে সে পায় ৮শ টাকা। এই দুই বছরে তিনি শুধু কারা কর্তৃপক্ষকে কমিশনের টাকা দিয়েছেন ৫০ হাজার টাকার উপরে। প্রতিদিন এইভাবে বন্দীর স্বজনদের কাছ থেকে কারা কর্তৃপক্ষ কমিশনের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ তুলেছেন অনেকেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কারারক্ষী জানান, কারাগারের ক্যান্টিনে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ টাকায় বন্দিদের কাছে খাবার বিক্রি করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন কারা কর্তৃপক্ষ। বন্দীদের বরাদ্দকৃত খাবার পরিমাণে কম দিয়ে গুদাম থেকে আলু, পেয়াজ, রসুন, তেল, ডাল ও বিভিন্ন রকম মসলা ক্যান্টিনে নিয়ে যাওয়া হয়। আবার ছোটন বড়ুয়া নামের এক কারারক্ষীর মাধ্যমে বাইরে থেকে বিল ভাউচার সংগ্রহ করে ক্যান্টিনের নামে ক্রয় দেখানো হয় পণ্যগুলো। এসব খাবার ক্যান্টিন থেকে চড়া দামে বিক্রি করা হয় বন্দীদের। বন্দীদের প্রতিটি পণ্য কিনতে হয় বাজার মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দাম দিয়ে। এ ছাড়াও তাদের কারা ক্যান্টিনের বিক্রি বাড়ানোর জন্য সরকারি খাবারের নীতিমালার কোন তোয়াক্কা না করে বন্দীদের দেওয়া হচ্ছে নিম্নমানের খাবার। যা খাওয়ার উপযোগী নয় বলেও জানান তিনি।
এছাড়াও বন্দীদের বরাদ্দকৃত সাবান, চাল, গম, ডাল,গম ও বিভিন্ন খাবার গুদাম থেকে শাহ জামান নামের এক লাইসম্যানের মাধ্যমে বাইরে বিক্রি করা হয় বলে জানিয়েছেন খোদ কারাগারের একজন কর্মচারী।

আদালতে হাজিরা দিতে আসা কয়েকজন আসামী জানান, কারাগার থেকে ৭ দিন পরপর ফোনে স্বজনদের সাথে ১০ টাকায় ৫ মিনিট করে কথা বলার নিয়ম থাকলেও কারা কর্তৃপক্ষ বন্দীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন ৫ মিনিটে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা করে। কারাগারে বন্দী আসামীরা জানান, কারাগারের টেলিফোন অবৈধভাবে লিজ দেওয়া হয়েছে ইয়াবা কারবারিদের কাছে। সরকারি হিসাবে দৈনিক গড়ে আসামিদের সঙ্গে ৬শ লোক কথা বলার নিয়ম থাকলেও কারা কর্তৃপক্ষকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে দৈনিক কথা বলেন ১ হাজারের অধিক লোক। এইভাবে মোবাইলের মিনিট বাণিজ্য করেও কারা কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও জানান আসামীরা।

কয়েকদিন আগে কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়া এক ব্যাক্তি জানান, প্রথমদিন যদি যখন কোন আসামী কারাগারে যায় তাকে কোয়ারান্টাইন নামের একটি সেলে গাদাগাদি করে রাখা হয়। এরপর কারারক্ষীরা এসে আসামীদেরকে ওয়ার্ডে ভালো বেডে রাখার নামে ২ থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করে পরিবারের কাছ থেকে। চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে না পারলে চলে নির্যাতন। এভাবে ওয়ার্ডে ভালো বেডে রাখার নামে প্রতিদিন নতুন নতুন বন্দীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

কারাগারে একজন আসামী স্বজনদের সাথে দেখা করার নিয়ম রয়েছে ১৫ দিন পরপর একবার। অথচ কারারক্ষীদের ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা দিলে যতবার খুশি দেখা করা যায়। এভাবে প্রতিদিন কারারক্ষীরা সরকারী নিয়মের তোয়াক্কা না করে বন্দী ও বন্দীর স্বজনদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ভূক্তভোগীরা।

জানতে চাইলে কক্সবাজার জেল সুপার মোঃ শাহ আলম খান অভিযোগের বিষয়গুলো অস্বীকার করেন। এবং যারা এই অভিযোগগুলো করেছে তাদেরকে তার সামনে এসে বলার জন্য অনুরোধ করেন তিনি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কারা উপ মহাপরিদর্শক মোঃ আলতাব হোসেনের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোন উত্তর দেননি তিনি।###

আগেরামুতে ইয়াবাসহ মাদক কারবারি আটক
পরেনাইক্ষ‍্যংছড়ির সোনাইছড়িতে অবৈধ মোটরসাইকেলকে জরিমানা