
এম. বেদারুল আলম :
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার প্রকল্প বাঁকখালী নদী ড্রেজিং এবং রক্ষাবাধ প্রকল্পে চলছে পুকুরচুরি। ২৮.৫ কিলোমিটারের কাজ গত ১ বছরে ২২ কিলোমিটার সম্পন্ন করে বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। কাজে অনিয়ম হলেও বেশিরভাগ কাজ শেষ হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে স্বস্তি ফিরলেও কাজের মান নিম্নমানের হওয়ায় পুনরায় বাঁকখালী নদী ভরাট হওয়ার শংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২২ কিলোমিটারের খনন কাছে উত্তোলিত বালি নিয়ে শত কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা করে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে খননে দায়িত্বরত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং এর বিরুদ্ধে। রামু ও সদরের ৩ জন চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় কয়েকটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুরো ২২ কিলোমিটার নদী খননের উত্তোলিত বালি অবৈধভাবে বিক্রি করে পকেট ভারী করেছে বলে জানা গেছে। তবে বালি বিক্রি করে ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবার্হী প্রকৌশলী অয়ন কুমার ত্রিপুরা। সরকার নির্ধারিত ১ ঘন মিটার বালির দাম ৩৫ টাকা হলে উত্তোলিত ২০ লাখ ঘনফুট বালির মধ্যে মাত্র ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছে ওয়ের্স্টান এমন প্রশ্নের জবাবে বিপুল পরিমান রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বালি নিয়ে কোটি কোটি টাকা কর ফাঁকির মূলে রয়েছেন ওয়েস্টার্ন এর প্রজেক্ট ম্যানেজার মোঃ সরওয়ার এবং শাহজাহান আলী। ড্রেজিং এর বালি নিয়ে নৈরাজ্য বিষয়ে জানতে সরেজমিনে বেশ কয়েকবার এ প্রতিবেদক মাঠে প্রকল্প পরির্দশনে গেলে এর সত্যতা পাওয়া যায়।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার প্রকল্প বাঁকখালী নদীর ড্রেজিং এবং রক্ষাবাঁধের জন্য ২০৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গেল ২০১৭-১০১৮ অর্থ বছরের বাজেট থেকে উক্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে রামু এবং কক্সবাজার সদরের ২১ ইউনিয়ন বন্যার কবল রক্ষা পাবে পাশাপাশি ১৯ হাজার ৪শ হেক্টর জমিতে নির্বিগ্নে চাষাবাদ করতে পারবে কৃষকরা। বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় নদী ড্রেজিং হচ্ছে ২৮ কিলোমিটার এবং বাঁকখালীর রক্ষাবাঁধ ণির্মান করা হচ্ছে ৩৮ কিলোমিটার। এটি কস্তুরা ঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে খনন আরম্ভ হয়। শেষ হবে রামুর বাঁকখালী নদীর হাইটুপি অংশে। এর খনন কাজ শেষ হলে কক্সবাজারবাসির নদী নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরাজমান সমস্যা কেটে যাবে। চাষাবাদে জাতীয় উৎপাদনে জেলার ২০ হাজার হেক্টর জমির আবাদ যোগ হবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে কাজের কক্সবাজার সদরের অংশ শেষ হয়ে বর্তমানে রামুতে চলছে ড্রেজিং। গতকাল রামুর লম্বরীপাড়া ঘাটে দেখা যায়, বালি উত্তোলন করে ধানি জমিতে পাইপ লাইন দিয়ে রেল লাইন প্রকল্প ভরাট করছে। বালির সাথে পানি পড়ে সবুজ ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রামুর লম্বরী পাড়া, ওমখালী, রাজারকুলের সিকদারপাড়া, মনসুরআলী সিকদার আইডিয়াল স্কুল, নয়াপাড়া, মিঠাছড়ির চেইন্দা, এমিউজমেন্টপার্ক এলাকা, খরুলিয়ার ঘাটপাড়ায় বাঁকখালী নদী থেকে বালি উত্তোলন করে রাতে চুপিসারে সরকারি রাজস্ব ফাঁিক দিতে শতাধিক ডাম্পার করে বালি বিক্রি করে দিচ্ছে । যথারীতি অভিযোগের তীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প কর্মকর্তা সরওয়ার ও শাহজাহান আলীর দিকে। নামেমাত্র সরকারি রাজস্ব দেখিয়ে পুরো বাঁকখালী ড্রেজিং এর বালি বিক্রি করে দিচ্ছে সিন্ডিকেটটি। উক্ত সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত রয়েছে সদর ও রামু উপজেলার ৩ জন চেয়ারম্যান এবং ১০ জন স্থানীয় আওয়ামীলীগ নামধারী হাইব্রিড নেতা। কোন সংবাদ মাধ্যম বালি নিয়ে নৈরাজ্যের প্রতিবেদনের জন্য গেলে উক্ত নেতারা তাদের বশ করার চেষ্টা চালায়। বালি নিয়ে নৈরাজ্য এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে অনিয়মই যেন এখানে নিয়মে পরিনত হয়েছে।
এদিকে চলমান রেল লাইন প্রকল্পের ভরাট কাজের পাশাপাশি জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে বিক্রি হচ্ছে ড্রেজিং এর বালি। অথচ বালি উত্তোলনের কারণে সদরের চাঁন্দেরপাড়া, ঘাটকুলিয়াপাড়া, নয়াপাড়া, খরুািলয়া, ঘাটপাড়া, ওমখালী, রাজারকুলের বিস্তৃীর্ণ সবুজ ধানক্ষেত, শীতকালিন সবজি ক্ষেত বালি ফেলে ধংস করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং। কোন ক্ষেত মালিককে এ পর্যন্ত কোন ধরনের ক্ষতি পূরণ দেয়নি। অথচ বালি বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করছে তারা।
এ ব্যাপারে বাঁকখালী নদী ড্রেজিং প্রকল্পের ব্যবস্থাপক শাহাজাহান সরকার জানান, আমরা কারো ক্ষতি করছিনা। সরকারকে রাজস্ব দিয়ে বালি বিক্রি করছি। তিনি আগামীকাল অফিসে এসে দেখা করার জন্য বলে মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
বালি উত্তোলন এবং বালি নিয়ে নৈরাজ্য এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ২ শীর্ষ কর্মকর্তার রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবার্হী প্রকৌশলী অয়ন কুমার ত্রিপুরা বলেন, বালি নিয়ে আমাদের একটি দল সার্ভে করে গেছেন। ২২ কিলোমিটার খনন কাজে প্রায় ২০ লাখ ঘনফুট বালি উত্তোলন হয়েছে। বালি বিক্রির মাধ্যমে আমরা ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছি। কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি এবং কাজের মান নিয়ে যে অনিয়ম তা তিনি ঢাকা থেকে ফিরে তদন্ত করে জানাবেন বলে দৈনিক কক্সবাজারকে নিশ্চিত করেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দু’কর্মকর্তার নানা অনিয়ম এবং কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় যেসব জনপ্রতিনিধি -পাতি নেতা চাঁদা আদায় করে দেশের চলমান উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্থ করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে কাজের মান নিশ্চিত করা যাবে। যথাসময়ে শেষ করতে পারবে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প বাঁকখালী ড্রেজিং।













