
রাশেদুল ইসলামঃ
সৃষ্টিকর্তার নিপুন হাতে গড়া পাহাড়-সমুদ্রের মিতালীতে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত সৈকতের নগরী কক্সবাজার। যার রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন বালুকাময় সমুদ্র সৈকত। ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনের ধারায় প্যানোয়া, পালঙ্কি নাম থেকে আজকের কক্সবাজার।
বিশ্বের বিস্ময় হওয়ার কথা ছিল এ কক্সবাজার। অযোগ্য ও দূর্নীতিপরায়ন নেতৃত্বের হাতে পড়ে ‘সেই কক্সবাজার’ আজ ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় আর খানাখন্দের শহরে পরিনত হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়নের আর উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যেন কক্সবাজারবাসীর জন্য অনেকটা শনির দশায় পড়েছে। এর ফলে জেলায় কর্মহীন ও ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
নেতৃত্বের ভার যাদের উপর তাদের হাতে কি নিরাপদ এই জেলা, সমুদ্র সৈকত, নদী, পাহাড়, জলরাশি, জীববৈচিত্র্য, মানব সভ্যতা? আজ সবটাই হুমকির সম্মুখীন।
দখলের কবলে পড়ে আজ বিলীন হওয়ার পথে পৃথিবীর দীর্ঘতম বালিয়াড়ির সমুদ্র সৈকত। আজ বিলুপ্তির পথে সমুদ্র লতাসহ বহু জীববৈচিত্র্য। যারা এই সমুদ্র পাড় ও তার জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার দায়িত্বে তারাই যেন ধ্বংসকারি আর ভক্ষকে পরিণত হয়েছেন।
অদূরদর্শী ও দূর্নীতিপরায়ন নেতৃত্ব, রোহিঙ্গা সমস্যা, অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প আর অর্থ-লিপ্সু প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সৃষ্টিকর্তার অপার সৃষ্টিকে আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে।
রোহিঙ্গা বিপদ আজ আমাদের মাথার উপর। সারা পৃথিবী দূর থেকে দেখছে আর রোহিঙ্গাদের জন্য মানবতা দেখাচ্ছে। কিন্তু দু:সহ যন্ত্রণায় পিষ্ট হচ্ছি আমরা, কক্সবাজারের সাধারণ মানুষ। সাড়ে বাইশ লক্ষ জনসংখ্যার এই জেলায় নতুন-পুরাতন মিলিয়ে প্রায় পনেরো লক্ষ রোহিঙ্গা রিফিউজি। লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা আজ মূল স্রোতের সাথে মিশে গেছে। জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায় জ্ঞান দিচ্ছেন, মানবতার বাণী শোনাচ্ছেন, সহানুভূতি দেখাচ্ছেন কিন্তু দায়িত্ব নিচ্ছেন না কেউ। একজন রোহিঙ্গাও আজ পর্যন্ত নিজ দেশে ফেরত যায়নি। পৃথিবীর কোন দেশ একজন রোহিঙ্গাকেও তাদের দেশে আশ্রয় দেওয়ার আগ্রহ দেখায়নি। সমুদ্র পাড়ের এ জেলার মানুষেরই যেন একমাত্র দায় মানবতা দেখানোর।
কক্সবাজারের মানুষ এ ভার আর একা সইতে পারছে না। হয় সবাই মিলে ওদের ফেরত পাঠান মিয়ানমারে, না হয় ভাগ করে নিয়ে যান অন্য কোন জেলায়; অন্য কোন দেশে। আমাদের ক্ষমা করুন, কক্সবাজারবাসীর পক্ষে একা আর মানবতা দেখানো সম্ভব নয়।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্টির অধিকাংশেরই অবস্থান যেমন এখন কক্সবাজারে, সেটিকেই পুঁজি করে দেশি-বিদেশী সংস্থার পাশাপাশি দেশের সমস্ত সরকারি সংস্থাগুলোর তৎপরতা এখন কক্সবাজারে। সবাই কক্সবাজারের জমির জন্য মরিয়া। যাদের অফিস করার জন্য এক একর জমির প্রয়োজন তারা চাইছেন একশো একর জমি; নানা অছিয়তে নিয়েও নিচ্ছেন সেই জমি। কক্সবাজার যেন তাদের পূর্ব পুরুষের তালুক। পর্যটন হোটেল-মোটেলগুলো আজ এনজিওর অফিস আর গ্যারেজে পরিণত হয়েছে। কক্সবাজারের স্থায়ী মানুষগুলো আজ ভূমিহীন হওয়ার পথে।
রোহিঙ্গা রিফিউজির মতো কক্সবাজারের মানুষও যেন বঙ্গোপসাগরে ছোট্ট ডিঙ্গি নিয়ে অজানার পথে পাডি দিবে। রোহিঙ্গার পাশে বাংলাদেশ ছিল, কক্সবাজারের মানুষ ছিল। আজ ভূমিহীন কক্সবাজারের মানুষের পাশে কে থাকবে? কক্সবাজারের উদ্বাস্তু মানুষকে কে সাহায্য আর আশ্রয় দিবে?
মাতারবাড়ীতে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প একটি হলে সওয়া যেতো। মহেশখালিসহ কক্সবাজারে নাকি সতেরটি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প হবে। এতো এতো বিদ্যুৎ প্রকল্প আমরা চাই না। আমরা চেয়েছিলাম ডিপ সী-পোর্ট, আমরা চেয়েছিলাম পর্যটন খাতের উন্নয়ন, আমরা চেয়েছিলাম কক্সবাজারের সমুদ্রের সুরক্ষা আর জীববৈচিত্র্য রক্ষার।
পৃথিবীজুড়ে বন্ধ হচ্ছে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প, আমরা চালু করছি। সুন্দরবনসহ গোটা বিশ্ব কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভার সইতে পারছে না। আমরা কক্সবাজারের সাধারণ মানুষ এই ভার কিভাবে সইবে? এ বিষ কিভাবে গ্রহন করবো আমরা?
দেশের উচ্চ আদালত যদি পরিবেশ দূষণের দায়ে ইটভাটা বন্ধ করে দিতে বলে আর পরিবেশ রক্ষার জন্য সরকার ও ইটভাটা বন্ধ করার জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়; তাহলে আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে সারাদেশে ইটভাটা বন্ধে একমত হয়ে বিকল্প ইট তৈরির কার্যক্রম হাতে নেয়। তবে লক্ষ লক্ষ গুণ বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনকারী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর আশপাশে আমরা কিভাবে জীবন ধারণ করবো?
দয়া করে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। না হয় অন্য কোথাও সরিয়ে নিন। কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প আমরা চাই না। প্রয়োজনে ব্যাপকভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করুন। বিভিন্ন সংস্থার নামে ব্যাপকভাবে জমি অধিগ্রহণ বন্ধ করুন। অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ নেতৃত্বের হাত হতে কক্সবাজারকে রক্ষা করুন।
সাগর-পাহাড়ের অপূর্ব মিতালী, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, নানা ধর্মের-বর্ণের মানুষের অসাম্প্রদায়িক সহাবস্থান, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সমাহারসহ প্রকৃতির ভিন্নতর বৈশিষ্ট্যের কারণে কক্সবাজার একেবারেই অনন্য। এই কক্সবাজারকে স্ব-মহিমায় টিকে থাকতে দিন। প্রাণভরে নি:শ্বাস নিতে চাই আমাদের আগামী প্রজন্মকে সাথে নিয়ে।
সমুদ্র সৈকত, সামুদ্রিক মাছ, লবণ, মিষ্টি পান-সুপারি, শুটকি, বার্মিজ মার্কেট, অ¹মেধা ক্যাং, আদিনাথ মন্দির/পাহাড়সহ আমাদের ঐতিহ্যগুলো নিয়ে আমাদেরকে আমাদের মতো করে বেঁচে থাকতে দিন।
-রাশেদুল ইসলাম
প্রধান সম্পাদক, দৈনিক দৈনন্দিন ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা।













