
সিবিকে ডেস্কঃ
অনুগত শিক্ষকদের নামে কাগজে-কলমে অসংখ্য ভুয়া প্রকল্প ও বিনা রশিদে কলেজ ফান্ডের অন্তত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন রামু সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ (সহযোগী অধ্যাপক) মুজিবুল আলম। তাছাড়া প্রশংসা পত্র বিতরণ, প্রত্যয়ন পত্র, ভর্তি বাতিল, নির্বাচনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জরিমানা আদায়; একইরকম কয়েকটি খাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিনা রশিদে কয়েক লাখ টাকা আদায়েরও অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ আছে, ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট রামু কলেজ সরকারি হয়। সরকারি করণের পাঁচ বছর হলেও এখন পর্যন্ত কলেজ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেসরকারি নিয়মে বেতন ও অন্যান্য ফি আদায় করা হচ্ছে। যে কারণে চরম অসন্তোষ রয়েছে রামু সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে।
এ ছাড়াও অধ্যক্ষ মুজিবুল আলমের বিরুদ্ধে তার নিজের শিক্ষকসহ বয়োজ্যেষ্ঠদের নাম ধরে ডাকা; তাদের নিজ টেবিলের সামনে দাঁড় করিয়ে কথা বলা; শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার ও রুঢ় আচরণ দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
এমনকি কথায় কথায় অধ্যক্ষ মুজিবুল আলম শিক্ষক-কর্মচারীদের হুমকি দেন জানিয়ে এক শিক্ষক বলেন, তিনি সব সময় বলেন, আমার ক্ষমতা সম্পর্কে আপনারা জানেন? আমি ২৪তম বিসিএস। আমি আপনাদের এসিআর দেব।
২০২২ সালের ৮ আগস্ট কলেজের অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পান ২৪তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা মুজিবুল আলম।
অধ্যক্ষ হিসেবে মুজিবুল এ কলেজে যোগ দেওয়ার পর এইচএসসি, ডিগ্রি ও অনার্স পর্যায়ে অন্তত এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পাশ করেছে। তাদের কাছ থেকে বিনা রশিদে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা করে মাসিক বেতন আদায় করেছেন। একইভাবে এইচএসসির নির্বাচনী পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিনা রশিদে মোটা অংকের জরিমানার টাকা নিয়েছেন তিনি। কিন্তু কলেজ ফান্ডে জমা না করে নিজেই আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া ভর্তি বাতিল, ট্রান্সফারসহ কয়েকটি খাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
বিনা রশিদে টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন কলেজের অফিসের প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক আলাউদ্দিন। তিনি বলেন, ইতিপূর্বে রশিদমূলে টাকা নিয়ে ব্যাংকে জমা দিতাম। কিন্তু নতুন অধ্যক্ষ স্যার যোগদানের পর বিষয়গুলো তিনি নিজেই তদারকি করেন।
বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বর্তমান অধ্যক্ষ যোগদানের পর তার অনুগত কয়েক শিক্ষকের নামে কাগজে-কলমে ৬০ থেকে ৭০টি প্রকল্প দেখিয়েছেন। দুজন শিক্ষকের নামে ১৫টি করে প্রকল্প দেখানো হয়েছে। এসব প্রকল্পে বড় ধরনের অসঙ্গতির প্রমাণও পাওয়া গেছে। এরকম অর্ধশতাধিক প্রকল্পের নথি প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
একটি নথিতে দেখা গেছে, গত ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালনে খাবারের আয়োজন করা হয়। এদিন অনুষ্ঠানে যোগ দেন ৫০ শিক্ষক ও অন্তত ৩০ শিক্ষার্থী। শিক্ষকদের খাসির মাংস, ডিম, ডাল, সাদা ভাত ও দই দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। উপস্থিত শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় নাস্তার প্যাকেট। অনুষ্ঠানের জন্য একটি ব্যানারও ছাপানো হয়। অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক ছিলেন সহকারী অধ্যাপক সুপ্রতীম বড়ুয়া।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ভাষ্য, অনুষ্ঠানে খরচ হয়েছে সর্বসাকুল্যে ৪০-৫০ হাজার টাকা। কিন্তু ভুয়া বিল-ভাউচার বানিয়ে খরচ দেখানো হয়েছে দুই লাখ ৯৮ হাজার টাকা।
একইভাবে কলেজের বার্ষিক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক, বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করে খরচ দেখানো হয়েছে ৬ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের আহ্বায়কও ছিলেন সহকারী অধ্যাপক সুপ্রতীম বড়ুয়া।
প্রকল্পে মাটি ভরাটের নামে ২ লাখ, সাউন্ড সিস্টেমের জন্য ৫০ হাজার, প্রকাশনা ২৯ হাজার ৫০০, লেবার ও অন্যান্য ৪০ হাজার টাকা দেখানো হয়। ১৩টি খাতে মোট খরচ দেখানো হয় ৬ লাখ টাকা। কিন্তু মূল খরচ মোট অর্থের পাঁচগুণ ছিল বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রকল্পের আওতায় বাস্তবে মাটি ফেলা হয়েছে ৩৮ পিকআপ। প্রতি পিকআপ ৮৫০ টাকা করে ধরা হয়। লেবারসহ এ খাতে সবোর্চ্চ ৪০-৪২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু বিল দেখানো হয়েছে ২ লাখ টাকার।
এসব ব্যাপারে সহকারী অধ্যাপক সুপ্রতীম বড়ুয়া বলেন, আমি প্রকল্পের আহ্বায়ক এটি সত্য। কিন্তু আমার বেশিরভাগ প্রকল্পের কাজ করেছেন বাংলা বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ হোসাইন। আমি শুধু চেক ও ভাউচারে সই করেছি। আমি জানি এভাবে না দেখে সই করাটা উচিত হয়নি। তবু অধ্যক্ষ যেহেতু আমার ছাত্র তাই না করে পারিনি।
একইভাবে ২০২২ সালের অক্টোবরে আয়োজিত দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানের নামেও বড় ধরনের অসঙ্গতির প্রমাণ মিলেছে। এ অনুষ্ঠানে কলেজ ফান্ড থেকে ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৫০ টাকা খরচ দেখানো হয়। অথচ প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তিনশ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়েছিল। ঐ অনুষ্ঠানের ব্যয় দেখানো হয়েছিল ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫০ টাকা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এ অনুষ্ঠানের বাস্তব খরচ ছিল আড়াই লাখ থেকে দুই লাখ ৭০ হাজার টাকা।
এ অনিয়মের কথা স্বীকার করেছেন প্রকল্পের আহ্বায়ক ও ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইসরাত জাহান। তিনি বলেন, আমাকে কাগজে কলমে আহ্বায়ক করা হয়েছে। আমার নামে চেক ইস্যু ও সই নেওয়ার পর একটা টাকাও আমি চোখে দেখিনি। অধ্যক্ষ নিজেই সব খরচ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, পরে বিল ভাউচারে বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখার পর দুইবার সই না করে ফিরিয়ে দিই। এরপর অধ্যক্ষ অনুরোধ করায় সই করি।
কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছলিম উল্লাহর নামে রয়েছে ১৫টি প্রকল্প। এর মধ্যে শুধুমাত্র ক্রোকারিজ ক্রয়ের প্রকল্প আছে চারটি। এতে অর্থ খরচ হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার। পৃথক আরও ৭টি প্রকল্পের আওতায় ২৪টি ফ্যান; অধ্যক্ষের কক্ষে এসি সংযোগ; ফ্রিজ, সোফা, কার্পেট কেনাসহ নানা প্রকল্পে খরচ হয়েছে ৯ লাখ টাকার বেশি।
ছলিম উল্লাহ জানিয়েছেন, তিনি নিজে কয়েকটি ফ্যান ও ক্রোকারিজ কিনেছিলেন। এসি-ফ্রিজসহ অনেকগুলো বড় মাপের কেনাকাটা অধ্যক্ষ নিজেই করে আমার কাছ থেকে ভাউচারে সই করেছেন। বেশিরভাগ প্রকল্পের টাকা আমি চোখে দেখিনি। ভবিষ্যতে আমার নামে প্রকল্প না দেওয়া ও ক্রয় কমিটি থেকে বাদ দিতে আমি তাকে অনুরোধ করেছি।
কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আব্দুল হক জানিয়েছেন, তিনি ২০১২ সালের ১৮ জুন সহকারী অধ্যাপক সাহাবউদ্দিনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। এ সময় কলেজ ফান্ডে সর্বসাকুল্যে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা জমা ছিল।
আরেক শিক্ষক জানান, বর্তমানে কলেজ ফান্ডে ৫০ লাখ টাকার কম স্থিতি আছে। ফান্ডের মোটা অংকের টাকা আত্মসাতের জন্য ভুয়া প্রকল্প তৈরি করেছেন অধ্যক্ষ মুজিবুল আলম। নিরপেক্ষ তদন্ত করলে আসল সত্য বেরিয়ে আসবে বলেও দাবি করেন তিনি।
কলেজের আইসিটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আকতার জাহান বলেন, বিনা রশিদে প্রশংসা পত্র, প্রত্যয়ন পত্র, ফি আদায়, ভুয়া প্রকল্প দিয়ে টাকা আত্মসাৎসহ নানা অনিয়মের বিষয়গুলো কলেজে ওপেন সিক্রেট। কিন্তু কেউ মুখ খুলতে চান না।
জানতে চাইলে রামু সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মুজিবুল আলম সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন।৮ অক্টোবর থেকে শেনীভেদে মাসিক বেতন সরকারী নিয়মেই আদায়ের ঘোষনা করা হয়েছে বলে জানান। তবে ভূয়া প্রকল্প-বিল ভাউচার ও বিনা রশিদে অর্থ আদায়ের বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।-বাংলানিউজ













